
মোঃ খাইরুল ইসলাম, নিজস্ব প্রতিবেদক: গাজীপুরের শিল্প নগরী কালিয়াকৈরে শিল্প কারখানা গুলোতে যখন বেতন হয় তখন শ্রমিকরা তাদের কষ্টার্জিত বেতনের টাকা তোলার জন্য বুথের সামনে হাজারো শ্রমিক লাইন ধরে ঘন্টার পর ঘন্টা অপেক্ষা করে।
গার্মেন্টস কর্মীরা চরম ভোগান্তিতে, চরম ভোগান্তি পোহাচ্ছে প্রতিমাসে। বেতন পেয়েও টাকা তুলতে না পেরে চরম ভোগান্তিতে হাজারো গার্মেন্টস কর্মী। এমনই এক হৃদয় বিদারক, আবেগঘন চিত্র ধরা পড়েছে কালিয়াকৈর বাসস্ট্যান্ড ডাচ-বাংলা ব্যাংক ATM বুথে। দেখা যায়, কালিয়াকৈর বাসস্ট্যান্ড এলাকায় ডাচ-বাংলা ব্যাংক ফাস্ট ট্র্যাক ও ATM বুথের সামনে শত শত নারী-পুরুষ গার্মেন্টস শ্রমিক লম্বা লাইনে দাঁড়িয়ে আছে।
সন্ধ্যা হয়ে গেছে, রাস্তায় গাড়ি দাঁড়িয়ে, তার মধ্যেও শ্রমিকদের লাইন শেষ হচ্ছে না। পাশেই বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক, ওয়ালটন প্লাজা, ভলভো ব্যাটারির দোকান। বুথের সামনে তিল ধারণের ঠাঁই নেই। সাদা প্রাইভেট কার গুলো আটকে আছে, কিন্তু শ্রমিকের লাইন চলছেই।
জানা গেছে, কালিয়াকৈর বাইপাস, চন্দ্রা, মৌচাক, কোনাবাড়ি, সফিপুর এলাকায় প্রায় ৩ শতাধিক গার্মেন্টস কারখানা রয়েছে। প্রায় ৪-৫ লক্ষ শ্রমিক এখানে কাজ করে। কিন্তু পুরো কালিয়াকৈর বাসস্ট্যান্ড এলাকায় হাতে গোনা ২/৩ টি ATM বুথ। তার মধ্যে ডাচ-বাংলা ব্যাংকের বুথে বেশিরভাগ কারখানার বেতন হয়। ফলে বেতনের দিন ৭ তারিখ থেকে ১০ তারিখ পর্যন্ত এই বুথে ১০-১৫ হাজার শ্রমিক ভিড় করে। আর তখনই শুরু হয় ৩ মহা-সমস্যা।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, শ্রমিকরা ৩টি কারণে চরম ভোগান্তিতে পড়ে।
১. বুথে টাকা থাকে না-৫০০/১০০০ শ্রমিক টাকা তুললেই বুথের টাকা শেষ। ব্যাংক কর্তৃপক্ষ সময়মতো টাকা লোড দেয় না।
২. নেটওয়ার্ক সমস্যা-সার্ভার ডাউন, নেটওয়ার্ক বিজি, লিংক ফেইল -ঘন্টার পর ঘন্টা দাঁড়িয়ে থেকেও ফিরতে হয়।
৩. দীর্ঘ লাইন ও ধাক্কাধাক্কি- একটি বুথে হাজারো শ্রমিক, নারী শ্রমিকদের ইজ্জত নিয়ে টানাটানি, রাত ১০টা পর্যন্ত লাইন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক নারী শ্রমিক কাঁদতে কাঁদতে বলেন, সকাল ১০ টায় ডিউটি শেষ করে ১১ টা থেকে লাইনে দাঁড়াইছি, এখন বাজে বিকাল ৫ টা। এখনো টাকা পাই নাই। ভিতরে টাকা শেষ। বাচ্চার দুধ কিনবো কেমনে? বাসায় বাজার নাই।
আরেক শ্রমিক রুবেল হোসেন (২৮) ক্ষোভ নিয়ে বলেন, ঘন্টার পর ঘন্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। একবার টাকা শেষ হয়ে যায়, একবার নেটওয়ার্ক থাকে না। আমাদের কষ্ট দেখার কেউ নাই। কোম্পানি বলে ব্যাংকে বেতন দিছে, কিন্তু বুথ থেকে টাকা তুলতে আমাদের জান শেষ। আমরা কি মানুষ না?
সুমি আক্তার (২৪) নামে এক নারী শ্রমিক বলেন, মহিলা মানুষ লাইনে দাঁড়াতে খুব কষ্ট। ধাক্কাধাক্কি লাগে। ছেলেরা গায়ের উপর পড়ে। রাত হয়ে যায়। বাড়ি ফিরতে ভয় লাগে। যদি আরও ২/৩ টা বুথ বাড়াইতো, আমাদের এত কষ্ট হইতো না। আমরা গার্মেন্টসে ১২ ঘন্টা ডিউটি করে আবার এখানে ৫ ঘন্টা দাঁড়াইয়া থাকি, এইডা কোন জীবন?
এলাকাবাসীর দাবি, অবিলম্বে কালিয়াকৈর বাসস্ট্যান্ড, চন্দ্রা, মৌচাক ও বাইপাস এলাকায় ডাচ-বাংলা ব্যাংক সহ অন্যান্য ব্যাংকের আরও ১০-১৫ টি ATM বুথ স্থাপন করা হোক। বেতনের সময় বুথে পর্যাপ্ত টাকা সরবরাহ ও নেটওয়ার্ক সচল রাখা হোক। প্রতিটি বুথে একজন নিরাপত্তা কর্মী, ফ্যান ও সার্বক্ষণিক বিদ্যুৎ নিশ্চিত করা হোক। নারী শ্রমিকদের জন্য আলাদা লাইনের ব্যবস্থা করা হোক।
শ্রমিক নেতারা বলেন, শ্রমিকরা দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখে, রেমিটেন্স যোদ্ধাদের মতো গার্মেন্টস যোদ্ধা। তাদের বেতনের টাকা তুলতে এত ভোগান্তি কেন হবে? ব্যাংক কর্তৃপক্ষের লাভের জন্য শ্রমিকদের কষ্ট দেওয়া হচ্ছে। এটি অমানবিক।
এ বিষয়ে ডাচ-বাংলা ব্যাংক কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করছে ভুক্তভোগী হাজারো গার্মেন্টস শ্রমিক। অনতিবিলম্বে বুথের সংখ্যা না বাড়ালে শ্রমিক অসন্তোষ বড় আকার ধারণ করতে পারে এবং মহাসড়ক অবরোধের মতো ঘটনা ঘটতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা।
ঢাকা থেকে প্রকাশিত বহুল আলোচিত গনমাধ্যম জাতীয় দৈনিক চেতনায় মুক্তিযোদ্ধা পত্রিকা
© All rights reserved © 2018 News Smart
Leave a Reply