লেখক: মোঃ খাইরুল ইসলাম
নিজস্ব প্রতিবেদক, গাজীপুর
একটি কন্যাশিশু মানেই একটি সম্ভাবনাময় ভবিষ্যৎ। তার চোখে থাকে স্বপ্ন, মনে থাকে বড় হওয়ার প্রত্যাশা, আর জীবনে থাকে নিজের যোগ্যতায় প্রতিষ্ঠিত হওয়ার আকাঙ্ক্ষা। কিন্তু অল্প বয়সে বিয়ে সেই স্বপ্নকে থামিয়ে দিতে পারে। কেড়ে নিতে পারে শিক্ষা, স্বাধীনভাবে বেড়ে ওঠার সুযোগ এবং নিজের পায়ে দাঁড়ানোর সম্ভাবনা। তাই বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের সবাইকে সম্মিলিতভাবে এগিয়ে আসতে হবে।
‘শিশুবিবাহ আর নয়, কন্যা করবে বিশ্বজয়’—এই স্লোগানকে সামনে রেখে গড়ে তুলতে হবে বাল্যবিবাহমুক্ত একটি সুন্দর সমাজ। একটি কন্যাশিশুর হাতে অল্প বয়সে সংসারের দায়িত্ব তুলে না দিয়ে তার হাতে তুলে দিতে হবে শিক্ষার আলো, জ্ঞানের শক্তি এবং স্বাবলম্বী হওয়ার সুযোগ।
বাল্যবিবাহের কারণে অনেক কন্যাশিশুর পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যায়। বাধাগ্রস্ত হয় তাদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশ। অল্প বয়সে সংসারের দায়িত্ব নিতে গিয়ে তারা হারিয়ে ফেলে নিজেদের স্বপ্ন পূরণের সুযোগ। বাল্যবিবাহের ফলে স্বাস্থ্যঝুঁকি, শিক্ষাজীবনে ছেদ এবং অর্থনৈতিকভাবে অন্যের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ার আশঙ্কাও বাড়ে।
অথচ যথাযথ শিক্ষা, পরিবারের সহযোগিতা ও সামাজিক নিরাপত্তা পেলে এই কন্যাশিশুরাই ভবিষ্যতে চিকিৎসক, শিক্ষক, প্রকৌশলী, উদ্যোক্তা কিংবা দক্ষ নেতৃত্বের প্রতীক হয়ে উঠতে পারে। তাদের মেধা ও যোগ্যতা দেশের উন্নয়নেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে।
আমাদের সমাজে এখনো কিছু পরিবারে কন্যাসন্তানের অল্প বয়সে বিয়েকে সামাজিক নিরাপত্তা কিংবা পারিবারিক দায়িত্ব পালনের উপায় হিসেবে বিবেচনা করা হয়। দারিদ্র্য, অসচেতনতা, সামাজিক চাপ ও নিরাপত্তাহীনতার মতো বিষয়ও বাল্যবিবাহের পেছনে ভূমিকা রাখতে পারে।
কিন্তু মনে রাখতে হবে, কন্যাশিশু কোনো বোঝা নয়; সে পরিবারের সম্পদ, সমাজের শক্তি এবং দেশের ভবিষ্যৎ। তাই মেয়েদের অল্প বয়সে বিয়ে দেওয়ার পরিবর্তে তাদের পড়াশোনা চালিয়ে যেতে উৎসাহিত করতে হবে। অভিভাবকদের বুঝতে হবে, সন্তানের সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার অন্যতম প্রধান ভিত্তি হলো শিক্ষা, সচেতনতা, নিরাপত্তা ও সঠিক পরিচর্যা।
একটি মেয়েকে শিক্ষিত করে তোলা মানে শুধু একজন মানুষকে প্রতিষ্ঠিত করা নয়; বরং একটি পরিবারকে এগিয়ে নেওয়া এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সম্ভাবনার নতুন দরজা খুলে দেওয়া।
বাল্যবিবাহ প্রতিরোধের দায়িত্ব শুধু পরিবারের নয়। এ ক্ষেত্রে শিক্ষক, জনপ্রতিনিধি, ধর্মীয় নেতা, সামাজিক সংগঠন, গণমাধ্যমকর্মী এবং তরুণ প্রজন্মেরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।
বিদ্যালয়ে সচেতনতামূলক কার্যক্রম, অভিভাবকদের সঙ্গে মতবিনিময়, কন্যাশিশুর শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করা এবং বাল্যবিবাহের কুফল সম্পর্কে প্রচার বাড়ানোর মাধ্যমে সামাজিক সচেতনতা তৈরি করা সম্ভব।
কোথাও বাল্যবিবাহের আয়োজন হলে নীরব দর্শক হয়ে থাকা উচিত নয়। নিরাপদ ও আইনসম্মত উপায়ে সংশ্লিষ্ট প্রশাসন বা দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি জানাতে হবে। পাশাপাশি বাল্যবিবাহের ঝুঁকিতে থাকা শিশু ও তাদের পরিবারকে সচেতন করতে হবে, যাতে কোনো কন্যাশিশুকে ভয়, চাপ কিংবা সামাজিক প্রতিকূলতার মুখে পড়ে শৈশব হারাতে না হয়।
বাংলাদেশের বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন, ২০১৭ অনুযায়ী, সাধারণ নিয়মে বিয়ের ক্ষেত্রে মেয়েদের ন্যূনতম বয়স ১৮ বছর এবং ছেলেদের ২১ বছর। আইন সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি ও এর যথাযথ প্রয়োগ বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
প্রতিটি কন্যাশিশুর রয়েছে শিক্ষা লাভের অধিকার, নিরাপদ পরিবেশে বেড়ে ওঠার অধিকার এবং নিজের সম্ভাবনা বিকাশের অধিকার। তার ভবিষ্যৎ নির্ধারণের পথে অল্প বয়সে বিয়ে যেন বাধা হয়ে না দাঁড়ায়, সে দায়িত্ব আমাদের সবার।
অভিভাবকদের উচিত সন্তানদের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলা, তাদের মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া এবং জীবনের লক্ষ্য অর্জনে সহযোগিতা করা। একই সঙ্গে সমাজের প্রতিটি মানুষকে কন্যাশিশুর প্রতি ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তুলতে হবে।
আমরা যদি আজ একটি কন্যাশিশুর শিক্ষা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারি, তাহলে আগামী দিনে সে নিজের পরিবার, সমাজ ও দেশের উন্নয়নে অবদান রাখতে পারবে। তাই বাল্যবিবাহ প্রতিরোধকে শুধু সামাজিক আন্দোলন হিসেবে নয়, একটি মানবিক ও দায়িত্বশীল সমাজ গঠনের অঙ্গীকার হিসেবেও দেখতে হবে।
আসুন, আমরা সবাই প্রতিজ্ঞা করি—কোনো কন্যাশিশুর শৈশব কেড়ে নেব না, তার শিক্ষার পথ বন্ধ করব না এবং অল্প বয়সে বিয়ে দিয়ে তার ভবিষ্যৎকে অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দেব না।
আমাদের অঙ্গীকার হোক—
বাল্যবিবাহ বন্ধ করি, কন্যাশিশুর অধিকার নিশ্চিত করি।
শিক্ষার আলো ঘরে ঘরে জ্বালাই,
কন্যাশিশুর হাত ধরে সুন্দর বাংলাদেশ গড়ে তুলি।
মনে রাখতে হবে, একটি মেয়েকে শিক্ষিত করা মানে একটি পরিবারকে আলোকিত করা; আর বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ করা মানে একটি প্রজন্মের ভবিষ্যৎ রক্ষা করা।
শিশুবিবাহ আর নয়, কন্যা করবে বিশ্বজয়—বাল্যবিবাহমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার এখনই সময়।
ঢাকা থেকে প্রকাশিত বহুল আলোচিত গনমাধ্যম জাতীয় দৈনিক চেতনায় মুক্তিযোদ্ধা পত্রিকা
© All rights reserved © 2018 News Smart
Leave a Reply