
মতামত | লিখেছেন: ইসলামি স্কলার আলহাজ্ব মাও. জীবন দেওয়ান উজ্জ্বল
জনপ্রতিনিধিত্বে সনদ বড়, নাকি সততা–যোগ্যতা–জনসেবার মানসিকতা?
বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় জনপ্রতিনিধি নির্বাচনের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জাতীয় সংসদ থেকে শুরু করে ইউনিয়ন পরিষদ—প্রতিটি স্তরেই জনগণ তাদের প্রতিনিধি নির্বাচনের অধিকার রাখেন। কিন্তু জনপ্রতিনিধি হওয়ার যোগ্যতা নিয়ে আমাদের সমাজে প্রায়ই একটি প্রশ্ন সামনে আসে—শিক্ষাগত যোগ্যতা কতটা প্রয়োজন?
জাতীয় সংসদ সদস্য হওয়ার ক্ষেত্রে সংবিধানে কোনো নির্দিষ্ট শিক্ষাগত সনদ বাধ্যতামূলক করা হয়নি। নির্ধারিত সাংবিধানিক শর্ত পূরণকারী ২৫ বছর বয়সী বা তার বেশি বয়সের বাংলাদেশি নাগরিক সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী হতে পারেন।
তাহলে প্রশ্ন ওঠে—যিনি দেশের আইনসভায় গিয়ে আইন প্রণয়নের কাজে অংশ নিতে পারেন, তাঁর জন্য যদি নির্দিষ্ট শিক্ষাগত সনদ বাধ্যতামূলক না হয়, তাহলে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিত্বের ক্ষেত্রে শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়ে এত আলোচনা কেন?
অবশ্যই শিক্ষার গুরুত্ব অস্বীকার করার সুযোগ নেই। একজন জনপ্রতিনিধির দায়িত্ব পালনে জ্ঞান, সচেতনতা ও প্রশাসনিক বিষয় বোঝার সক্ষমতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে শিক্ষাগত সনদ থাকলেই যে একজন মানুষ ভালো জনপ্রতিনিধি হবেন—এমন নিশ্চয়তাও নেই।
একজন জনপ্রতিনিধির সবচেয়ে বড় সম্পদ হতে পারে তাঁর সততা, ন্যায়বোধ, মানুষের প্রতি দায়িত্ববোধ, সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতা, জনসেবার মানসিকতা এবং জনগণের কাছে জবাবদিহি করার সংস্কৃতি।
একইভাবে একজন উচ্চশিক্ষিত মানুষও যদি জনগণের সমস্যার কথা না শোনেন, অন্যায়-অনিয়মের বিরুদ্ধে অবস্থান না নেন কিংবা মানুষের অধিকার রক্ষায় দায়িত্বশীল না হন, তাহলে শুধু তাঁর শিক্ষাগত সনদ দিয়ে জনসেবার মান নিশ্চিত করা কঠিন।
অন্যদিকে, স্বল্পশিক্ষিত হলেও কোনো ব্যক্তি যদি সৎ, দায়িত্বশীল, মানবিক এবং জনগণের পাশে থাকার মানসিকতা রাখেন, তাহলে তাঁর সেই গুণগুলোকেও মূল্যায়নের আওতায় আনা প্রয়োজন।
এখানে মূল বিষয় হলো—আমরা জনপ্রতিনিধির কাছে কী চাই?
শুধু একটি সার্টিফিকেট, নাকি মানুষের জন্য কাজ করার যোগ্যতা?
শুধু ডিগ্রি, নাকি ন্যায়বোধ?
শুধু শিক্ষাগত পরিচয়, নাকি সততা ও জবাবদিহি?
আমার মনে হয়, এই প্রশ্নগুলো নিয়ে দল-মত নির্বিশেষে সমাজে একটি গঠনমূলক আলোচনা হওয়া প্রয়োজন। কারণ ইউনিয়ন পরিষদের একজন সদস্যও জনগণের প্রতিনিধি। তাঁর সিদ্ধান্ত ও কর্মকাণ্ড স্থানীয় মানুষের জীবনযাত্রায় সরাসরি প্রভাব ফেলতে পারে।
তাই জনপ্রতিনিধি নির্বাচনের ক্ষেত্রে শিক্ষার পাশাপাশি নৈতিকতা, সততা, সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা, আইন সম্পর্কে ধারণা, মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতা এবং জনকল্যাণে কাজ করার মানসিকতাকেও গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
গণতন্ত্রের মূল শক্তি জনগণ। জনগণ যাকে ভোট দিয়ে নির্বাচিত করেন, তিনিই তাদের প্রতিনিধি হয়ে ওঠেন। সেই কারণে প্রার্থীর যোগ্যতা যাচাইয়ের পাশাপাশি ভোটারদেরও সচেতন হওয়া জরুরি।
শেষ কথা একটাই—জনপ্রতিনিধি হওয়ার যোগ্যতা শুধু কাগজের সনদে সীমাবদ্ধ না থেকে মানুষের কল্যাণে কাজ করার বাস্তব সক্ষমতা, সততা ও দায়িত্ববোধের মধ্যেও প্রতিফলিত হওয়া উচিত।
কারণ পদটি যত ছোটই হোক, জনগণের আমানত ছোট নয়।
ঢাকা থেকে প্রকাশিত বহুল আলোচিত গনমাধ্যম জাতীয় দৈনিক চেতনায় মুক্তিযোদ্ধা পত্রিকা
© All rights reserved © 2018 News Smart
Leave a Reply