
দুই দেশের বাণিজ্য সম্প্রসারণে জ্বালানি, কৃষি, তথ্যপ্রযুক্তি ও শিল্প খাতে সহযোগিতার উদ্যোগ
রাশিয়া-বাংলাদেশ বিজনেস কাউন্সিলের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছেন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত রুশ ব্যবসায়ী ও ন্যাশনাল গ্রুপের কর্ণধার মিয়া সাত্তার। রাশিয়ার মস্কোতে রাশিয়ান ফেডারেশনের চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিতে বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত কাউন্সিলের সাংগঠনিক বৈঠকে তাঁর নতুন দায়িত্বের বিষয়টি সামনে আসে।
বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন চেম্বারের ভাইস প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পাদালকো। তিনি মিয়া সাত্তারকে নতুন দায়িত্বে স্বাগত ও অভিনন্দন জানান। একই সঙ্গে উদ্যোক্তাদের বাস্তব চাহিদার ভিত্তিতে কাউন্সিলের কার্যক্রম পরিচালনার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
ভ্লাদিমির পাদালকো বলেন, রাশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলের জন্য বাংলাদেশের বাজার নিয়ে বিশ্লেষণ তৈরি, সম্ভাবনাময় সহযোগিতার ক্ষেত্র চিহ্নিত করা এবং বাজারে প্রবেশের প্রতিবন্ধকতা দূর করার উদ্যোগ নিতে হবে। বাংলাদেশে ব্যবসা সম্প্রসারণে আগ্রহী রুশ কোম্পানিগুলোকে সরাসরি সহায়তা দেওয়ার বিষয়েও তিনি গুরুত্ব দেন।
তিনি আরও বলেন, রাশিয়া-বাংলাদেশ আন্তঃসরকার কমিশনের সহযোগী প্ল্যাটফর্ম হিসেবে কাজ করবে কাউন্সিল। এর মাধ্যমে ব্যবসায়ীদের প্রস্তাব ও সমস্যাগুলো সমন্বিতভাবে সরকারি পর্যায়ে তুলে ধরে বাণিজ্য এবং যৌথ প্রকল্প বাস্তবায়নের পথ সুগম করা হবে।
বৈঠকে রাশিয়ায় নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম দুই দেশের ঐতিহাসিক বন্ধুত্বের কথা স্মরণ করেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধে তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের সমর্থনের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, নতুন এই প্ল্যাটফর্ম দুই দেশের পারস্পরিক লাভজনক অর্থনৈতিক সহযোগিতা বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। কাউন্সিলের কার্যক্রমে বাংলাদেশ দূতাবাসের পক্ষ থেকে সব ধরনের সহযোগিতা দেওয়ার আশ্বাসও দেন তিনি।
রুশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দ্বিতীয় এশিয়া বিভাগের প্রধান ভ্যাচেস্লাভ এরমোলায়েভ বলেন, দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের পর বাংলাদেশ রাশিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম বাণিজ্যিক অংশীদার। দুই দেশের সহযোগিতার উল্লেখযোগ্য উদাহরণ হিসেবে তিনি রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্পের কথা তুলে ধরেন। পাশাপাশি আর্থিক লেনদেনের জটিলতা দূর করা এবং দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যে পণ্যের বৈচিত্র্য বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন।
রুশ অর্থনৈতিক উন্নয়ন মন্ত্রণালয়ের দক্ষিণ এশিয়া বিভাগের প্রধান আনাস্তাসিয়া রোমানোভা মনে করেন, কাউন্সিল গঠনের ফলে ব্যবসায়ীদের বাস্তব চাহিদা বিবেচনায় নিয়ে আন্তঃসরকার কমিশনের কর্মসূচি আরও বিস্তৃত করা সম্ভব হবে। জ্বালানি, রসায়ন, কৃষি-শিল্প ও তথ্যপ্রযুক্তিকে তিনি সম্ভাবনাময় সহযোগিতার ক্ষেত্র হিসেবে উল্লেখ করেন।
কাউন্সিলের চেয়ারম্যান মিয়া সাত্তার তাঁর বক্তব্যে জ্বালানি, কৃষি, ডিজিটাল প্রযুক্তি, পরিবহন অবকাঠামো ও হালকা শিল্পে দুই দেশের ব্যবসায়ীদের জন্য নতুন সুযোগ তৈরির ওপর গুরুত্ব দেন। সম্ভাব্য উদ্যোগের মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশে সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র ও শস্যগুদাম নির্মাণ এবং ঢাকায় রাশিয়ার সাবেক ট্রেড রিপ্রেজেন্টেশনের জায়গায় একটি শিল্পপার্ক গড়ে তোলা।
তিনি জানান, রুশ কোম্পানিগুলো ইতোমধ্যে বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্পের সঙ্গে কাজ করছে। পাশাপাশি বাংলাদেশ থেকে তৈরি পোশাক ও খাদ্যসামগ্রী আমদানি করছে। রাশিয়া ও ইউরেশীয় অর্থনৈতিক ইউনিয়নের বাজারে প্রবেশের সুযোগ বাড়াতে বাংলাদেশি মাছ ও সামুদ্রিক খাদ্য সরবরাহকারীদের প্রয়োজনীয় স্বীকৃতি বা অ্যাক্রেডিটেশন নিশ্চিত করার কাজও চলছে।
দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে বাংলাদেশে পণ্যের সার্টিফিকেশন প্রক্রিয়াকে দীর্ঘ ও ব্যয়বহুল বলে উল্লেখ করেন মিয়া সাত্তার। এ সমস্যা সমাধানে দুই দেশের সংশ্লিষ্ট সংস্থার মধ্যে মান নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার সমন্বয় এবং সনদের পারস্পরিক স্বীকৃতি প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব দেন তিনি।
মিয়া সাত্তারের মতে, রাশিয়ার ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের একটি বড় অংশের কাছে বাংলাদেশের পরিচিতি এখনো মূলত তৈরি পোশাকশিল্প ও রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রকল্পের মধ্যে সীমাবদ্ধ। এই ধারণার পরিবর্তন ঘটাতে তিনি সমন্বিত তথ্য পোর্টাল চালু, খাতভিত্তিক ব্যবসায়িক প্রতিনিধিদল বিনিময় এবং রুশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি ও রাশিয়ান এক্সপোর্ট সেন্টারের সহযোগিতায় দুই দেশের ব্যবসায়ীদের মধ্যে নিয়মিত যোগাযোগ গড়ে তোলার প্রস্তাব করেন।
তিনি বলেন, “আমাদের একক কোনো ফোরামের প্রয়োজন নেই, বরং নিয়মিত বিটুবি যোগাযোগ প্রয়োজন।” যৌথ প্রকল্পের অগ্রগতি পর্যালোচনা এবং ব্যবসায়িক সমস্যার সমাধানে কাউন্সিলের অধীনে স্থায়ী খাতভিত্তিক ওয়ার্কিং গ্রুপ গঠনের প্রস্তাবও দেন তিনি।
বৈঠকে রুশ প্রতিষ্ঠান ‘প্রডইনটর্গ’-এর মহাপরিচালক আলেকজান্ডার সিরতসেভ বাংলাদেশে রাশিয়ার সার ও শস্য সরবরাহের অভিজ্ঞতার আলোকে কৃষি-শিল্পবিষয়ক একটি ওয়ার্কিং গ্রুপ গঠনের প্রস্তাব দেন।
এ ছাড়া বৈঠকে কাউন্সিলের নির্বাহী পরিচালনা কাঠামো এবং ২০২৬-২৭ সালের প্রস্তাবিত কর্মপরিকল্পনা উপস্থাপন করা হয়। স্তানিস্লাভ সিমাকোভকে কাউন্সিলের নির্বাহী পরিচালক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। আগ্রহী প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিজ নিজ প্রস্তাব জমা দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়। আগামী নভেম্বরে আন্তঃসরকার কমিশনের বৈঠককে কেন্দ্র করে ঢাকায় দুই দেশের ব্যবসায়ীদের একটি বৈঠক আয়োজনের প্রস্তুতি নেওয়ার কথাও জানানো হয়।
অনুষ্ঠানে রাশিয়ান অ্যাসোসিয়েশন ফর ইন্টারন্যাশনাল কোঅপারেশনের মহাসচিব ভ্লাদিমির পোলজকভ, এসএমই করপোরেশনের ইভজেনিয়া ইগোরোভা, রাশিয়ান অ্যাসোসিয়েশন অব ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রির প্রেসিডেন্ট তাতিয়ানা বেলকেভিচ এবং নোভাটেকের সালতানাত সাকামবায়োভাসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
নতুন এই কাউন্সিলের মাধ্যমে জ্বালানি, কৃষি, শিল্প, প্রযুক্তি ও খাদ্যপণ্য খাতে সহযোগিতা বাড়ানোর পাশাপাশি দুই দেশের ব্যবসায়ীদের মধ্যে নিয়মিত যোগাযোগ এবং যৌথ বিনিয়োগের সুযোগ সম্প্রসারণের প্রত্যাশা করা হচ্ছে।
ঢাকা থেকে প্রকাশিত বহুল আলোচিত গনমাধ্যম জাতীয় দৈনিক চেতনায় মুক্তিযোদ্ধা পত্রিকা
© All rights reserved © 2018 News Smart
Leave a Reply