
মোঃ আব্দুল বাছির
সুনামগঞ্জ জেলা প্রতিনিধি
কর্মচাঞ্চল্য হারাচ্ছে কালীবাড়ি রোড, নদী রক্ষা করে কর্মসংস্থান চালুর প্রত্যাশা স্থানীয়দের
সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলার যাদুকাটা নদীতে বালু-পাথর উত্তোলন বন্ধ থাকায় কর্মসংস্থান ও স্থানীয় অর্থনীতিতে স্থবিরতা দেখা দিয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট এলাকার বাসিন্দা ও ব্যবসায়ীরা। একসময় শ্রমিকদের ব্যস্ততা, বারকি নৌকার আনাগোনা, পণ্য পরিবহন ও বেচাকেনার কোলাহলে মুখর থাকা বাদাঘাট বাজারের কালীবাড়ি রোডে এখন আগের মতো কর্মচাঞ্চল্য নেই। নদীকেন্দ্রিক কর্মকাণ্ডে ভাটা পড়ায় বিপাকে পড়েছেন শ্রমিক, নৌকার মাঝি, পরিবহনকর্মী ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা।
স্থানীয়দের মতে, যাদুকাটা নদী কেবল বালু-পাথর উত্তোলনের উৎস নয়; এটি তাহিরপুর ও আশপাশের এলাকার হাজারো মানুষের জীবন-জীবিকা এবং ব্যবসা-বাণিজ্যের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে জড়িয়ে রয়েছে। নদীকে কেন্দ্র করে শ্রমিক, বারকি নৌকার মাঝি, পরিবহনকর্মী, দোকানদার ও হোটেল-রেস্তোরাঁ ব্যবসায়ীদের কর্মসংস্থান গড়ে উঠেছে।
কর্মসংস্থান সংকটে শ্রমিকরা
জেলা প্রশাসনের তথ্যের বরাত দিয়ে জানা যায়, একসময় যাদুকাটা নদীকে কেন্দ্র করে প্রায় ৩০ হাজার শ্রমিক সরাসরি কাজ করতেন। তাঁদের মধ্যে প্রায় ১৫ হাজার শ্রমিক বারকি নৌকার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
নদীতে বালু-পাথর উত্তোলন বন্ধ বা সীমিত থাকলে এর প্রভাব শুধু শ্রমিকদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং নদীকেন্দ্রিক পুরো অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে এর প্রভাব পড়ে। নিয়মিত কাজ না থাকায় শ্রমিকদের আয় কমে যায়। এতে সংসারের খরচ চালানো, সন্তানদের পড়াশোনার ব্যয় বহন এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য কেনা কঠিন হয়ে পড়ে।
শ্রমিকদের আয় কমে যাওয়ায় স্থানীয় বাজারের বেচাকেনাও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। কারণ, শ্রমিকদের দৈনন্দিন কেনাকাটা ও পরিবহনসংশ্লিষ্ট ব্যয়ের ওপর অনেক ক্ষুদ্র ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের আয় নির্ভরশীল।
বাদাঘাট বাজারে কমেছে বেচাকেনা
একসময় যাদুকাটা নদীকে ঘিরে বাদাঘাট বাজারের কালীবাড়ি রোডসহ আশপাশের এলাকায় দিনভর মানুষের আনাগোনা ছিল। শ্রমিকদের চলাচল, নৌকা থেকে পণ্য পরিবহন এবং কেনাবেচাকে কেন্দ্র করে জমজমাট থাকত বাজারের বিভিন্ন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান।
বর্তমানে নদীকেন্দ্রিক কর্মকাণ্ডে স্থবিরতা দেখা দেওয়ায় ওই এলাকার ব্যবসা-বাণিজ্যে আগের মতো গতি নেই বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা। তাঁদের প্রত্যাশা, আইনসম্মতভাবে নদীকেন্দ্রিক কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হলে শ্রমিকদের আয় বাড়বে এবং বাজারের বেচাকেনাও আবার গতিশীল হবে।
অতীতেও তৈরি হয়েছিল কর্মসংস্থানের সংকট
এর আগে যাদুকাটা নদীতে বালু উত্তোলন দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকায় শ্রমিকদের কর্মসংস্থান নিয়ে সংকট তৈরি হয়েছিল বলে জানা যায়। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে পাঁচ মাস বন্ধ থাকার পর আদালতের রায়ে কার্যক্রম পুনরায় শুরু হলে সংশ্লিষ্ট শ্রমিকদের মধ্যে স্বস্তি ফিরে এসেছিল বলে স্থানীয় সূত্রে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে নদীকে ঘিরে উত্তোলন কার্যক্রমের ধারাবাহিকতা, আইনগত সীমাবদ্ধতা ও কর্মসংস্থানের ভবিষ্যৎ নিয়ে আবারও অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। এ পরিস্থিতিতে নদীর পরিবেশ রক্ষা এবং বৈধভাবে জীবিকা নির্বাহের সুযোগ নিশ্চিত করার বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে।
নদী রক্ষা ও জীবিকা নিশ্চিত করার দাবি
যাদুকাটা নদীতে বালু-পাথর উত্তোলনকে কেন্দ্র করে অবৈধ কার্যক্রম, নদীভাঙন ও পরিবেশগত ক্ষতির অভিযোগও রয়েছে। নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ, তীরবর্তী জনপদ ও প্রাকৃতিক পরিবেশ রক্ষায় এসব অভিযোগের যথাযথ তদন্ত এবং কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
স্থানীয়দের মতে, নদী রক্ষার পাশাপাশি শ্রমজীবী মানুষের জীবিকার বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা জরুরি। পরিবেশের ক্ষতি করে এমন অবৈধ উত্তোলন বন্ধ করার পাশাপাশি আইন ও আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী বৈধ কর্মসংস্থানের সুযোগ থাকলে তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। প্রয়োজনে কর্মহীন শ্রমিকদের জন্য বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থাও নেওয়া যেতে পারে।
প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় স্থানীয়রা
২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর মাসে যাদুকাটা-১ ও যাদুকাটা-২ বালুমহাল থেকে বালু উত্তোলন নিয়ে প্রশাসনিক নিষেধাজ্ঞা এবং পরবর্তী সময়ে হাইকোর্টের স্থগিতাদেশসংক্রান্ত খবর প্রকাশিত হয়েছে। তবে সংশ্লিষ্ট আদেশের সুনির্দিষ্ট বিষয়বস্তু ও বর্তমান কার্যকারিতা সরকারি নথি এবং আদালতের আদেশ থেকে যাচাই করা প্রয়োজন।
এ অবস্থায় স্থানীয়দের প্রত্যাশা, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ আইন ও আদালতের নির্দেশনা মেনে নদীর ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করার পাশাপাশি প্রকৃত শ্রমিকদের জীবিকার বিষয়টি বিবেচনায় নেবে। একই সঙ্গে অবৈধ উত্তোলন বন্ধ, নদীভাঙন প্রতিরোধ এবং পরিবেশ সংরক্ষণে কার্যকর তদারকি জোরদার করা হবে।
যাদুকাটা নদীকে ঘিরে গড়ে ওঠা অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে বহু মানুষের জীবন-জীবিকা জড়িত। তাই নদী ও পরিবেশ রক্ষার পাশাপাশি বৈধ কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা এখন স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অন্যতম প্রত্যাশা।
বাদাঘাট বাজারের বর্তমান স্থবিরতা শুধু বেচাকেনা কমে যাওয়ার চিত্র নয়; এটি নদীকেন্দ্রিক জীবিকার ওপর নির্ভরশীল মানুষের অনিশ্চয়তারও প্রতিফলন। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সমন্বিত উদ্যোগে নদীর পরিবেশ রক্ষা করে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হলে উপকৃত হবেন শ্রমিক, নৌকার মাঝি, পরিবহনকর্মী, ব্যবসায়ী ও স্থানীয় বাসিন্দারা।
স্থানীয়দের প্রত্যাশা, যাদুকাটা নদীকে রক্ষা করে আইনসম্মত কর্মসংস্থানের পথ সুগম করা হবে। নদী ও পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রেখে ফিরবে বাদাঘাট বাজারের কর্মচাঞ্চল্য, গতিশীল হবে স্থানীয় অর্থনীতি।
ঢাকা থেকে প্রকাশিত বহুল আলোচিত গনমাধ্যম জাতীয় দৈনিক চেতনায় মুক্তিযোদ্ধা পত্রিকা
© All rights reserved © 2018 News Smart
Leave a Reply