মোঃ খাইরুল ইসলাম
নিজস্ব প্রতিবেদক, গাজীপুর
গাজীপুরের কালিয়াকৈর উপজেলার মৌচাক ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের মাটিকাটা মাঝুখান এলাকার আমতলা সড়কটি দীর্ঘদিন ধরে বেহাল অবস্থায় পড়ে আছে। প্রায় পাঁচ থেকে ছয় বছর ধরে সড়কটি সংস্কারের অভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হলেও গত তিন বছর ধরে এর অবস্থা আরও শোচনীয় হয়ে উঠেছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। সামান্য বৃষ্টিতেই পিচঢালাই সড়কটি কাদা-পানিতে একাকার হয়ে চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়ে। এতে প্রতিদিন হাজার হাজার পোশাকশ্রমিক, স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষকে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।
সড়কটির এমন বেহাল দশায় ক্ষোভ বাড়ছে এলাকাবাসীর মধ্যে। দ্রুত সংস্কারের দাবি জানালেও দীর্ঘদিন ধরে কার্যকর সমাধান না পাওয়ার অভিযোগ তাঁদের। তবে সংশ্লিষ্ট প্রশাসন ও প্রকৌশল বিভাগ জানিয়েছে, সড়কটি সংস্কারে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
রোববার সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, আমতলা সড়কের বিভিন্ন স্থানে বড় বড় গর্ত তৈরি হয়েছে। উঠে গেছে পিচঢালাই ও ইট-সুরকি। কোথাও কোথাও জমে আছে হাঁটুপানি ও কাদা। অটোরিকশা, সিএনজি, মোটরসাইকেল, প্রাইভেট কার ও পিকআপ ভ্যানকে ঝুঁকি নিয়ে এসব গর্ত ও কাদাপানি পার হতে হচ্ছে।
সড়কের এক পাশে বিল ও জলাশয় থাকায় পরিস্থিতি আরও বিপজ্জনক হয়ে উঠেছে। বৃষ্টির সময় বিলের পানি সড়কে উঠে পড়ায় কোথায় রাস্তা আর কোথায় জলাশয়, তা বোঝা কঠিন হয়ে পড়ে। এতে যানবাহন উল্টে বিলের পানিতে পড়ে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন চালকেরা।
সড়ক দিয়ে গাদাগাদি করে শ্রমিক বহনকারী পিকআপ ভ্যান চলাচল করতে দেখা যায়। কাদার মধ্যে সাইকেল ও মোটরসাইকেল চালাতে গিয়ে অনেককে পা দিয়ে ঠেলে যানবাহন পার করতে হচ্ছে। এ অবস্থায় নারী, শিশু ও বয়স্ক পথচারীদের চলাচলও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে গর্ভবতী নারী ও অসুস্থ ব্যক্তিদের যাতায়াতে চরম ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
দীর্ঘ পাঁচ থেকে ছয় বছর ধরে এই সড়ক দিয়ে চলাচলকারী স্থানীয় বাসিন্দা মো. রুবেল মিয়া বলেন, “আমি এই রাস্তা দিয়ে পাঁচ থেকে ছয় বছর ধরে চলাচল করি। গত তিন বছর ধরে রাস্তাটির অবস্থা খুবই খারাপ। গার্মেন্টস সেক্টরে যাঁরা চলাচল করেন, তাঁদের ভোগান্তির কোনো শেষ নেই।”
পোশাকশ্রমিক সুমি আক্তার বলেন, “রাস্তাটি খুবই খারাপ। আমরা অনেক কষ্টে চলাচল করি। প্রতিদিন কাদাপানিতে কাপড় নষ্ট হয়। সময়মতো কারখানায় পৌঁছাতে না পারলে হাজিরা কাটা যায়। জীবন হাতে নিয়েই আমাদের কর্মস্থলে যেতে হয়।”
অটোরিকশাচালক আল আমিন বলেন, “এই রাস্তা দিয়ে গাড়ি চালানো খুবই কঠিন। যেকোনো সময় গাড়ি উল্টে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। কোনো রোগীকে নিয়ে যেতেও ভয় লাগে—গাড়ি উল্টে বিলের মধ্যে পড়ে যায় কি না। আমাদের দাবি, দ্রুত রাস্তাটি মেরামত করা হোক।”
এলাকাবাসী জানান, আমতলা সড়কটি এলাকার হাজারো মানুষের যাতায়াতের গুরুত্বপূর্ণ পথ। প্রতিদিন পোশাকশ্রমিকদের পাশাপাশি শিক্ষার্থী, ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষ এই সড়ক ব্যবহার করেন। অথচ দীর্ঘদিন ধরে সড়কটির দুরবস্থার কারণে তাঁদের দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।
স্থানীয়রা সংসদ সদস্য ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলেন, শুধু এই সড়ক নয়, গ্রামের ছোট ছোট চলাচলের রাস্তাগুলোর দিকেও নজর দেওয়া প্রয়োজন। দ্রুত সংস্কার না হলে দুর্ভোগ আরও বাড়বে বলে আশঙ্কা তাঁদের।
এ বিষয়ে গাজীপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য মো. মুজিবুর রহমান বলেন, “আমতলা সড়কের বেহাল দশার বিষয়টি আমি জানতে পেরেছি। মৌচাক ইউনিয়ন একটি গুরুত্বপূর্ণ শিল্প এলাকা। হাজার হাজার শ্রমিক এই রাস্তা দিয়ে চলাচল করেন। এই দুর্ভোগ কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। আমি ইতিমধ্যে উপজেলা প্রকৌশলীকে নির্দেশ দিয়েছি, আগামী কিছুদিনের মধ্যে এই রাস্তার জরুরি সংস্কারকাজ শুরু করার জন্য। গ্রামীণ জনপদে দ্রুত উন্নয়নের ছোঁয়া পৌঁছে দেওয়াই আমাদের প্রধান লক্ষ্য।”
কালিয়াকৈর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এ এইচ এম ফখরুল হোসাইন বলেন, “মৌচাক ইউনিয়নের আমতলা সড়কের বিষয়ে অভিযোগ আমরা পেয়েছি। বিষয়টি অত্যন্ত দুঃখজনক। এটি একটি জনগুরুত্বপূর্ণ রাস্তা। আমি আজই উপজেলা প্রকৌশলীকে সরেজমিনে তদন্ত করে প্রতিবেদন দিতে বলেছি। রাস্তাটি দ্রুত মেরামতের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। চলাচল স্বাভাবিক রাখতে আপাতত ইটের সোলিং বা বালু ফেলে সড়কটি চলাচলের উপযোগী করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।”
কালিয়াকৈর উপজেলা প্রকৌশলী (এলজিইডি) ইঞ্জিনিয়ার মো. মাকসুদুন্নবী বলেন, “মাটিকাটা মাঝুখান আমতলা সড়কটি আমাদের তালিকাভুক্ত। দীর্ঘদিন সংস্কার না হওয়া, ভারী যান চলাচল ও বৃষ্টির কারণে রাস্তাটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আমরা ইতিমধ্যে রাস্তাটি পরিদর্শন করেছি। এ জন্য একটি প্রকল্প তৈরি করা হচ্ছে। বরাদ্দ পেলেই ঢালাইসহ পূর্ণ সংস্কারকাজ শুরু করা হবে। আপাতত জনদুর্ভোগ লাঘবে জরুরি মেরামতের উদ্যোগ নেওয়া হবে, যাতে কোনো বড় ধরনের দুর্ঘটনা না ঘটে।”
স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও উপজেলা প্রকৌশল দপ্তরকে বারবার জানানোর পরও দীর্ঘদিন কার্যকর প্রতিকার না পাওয়ার অভিযোগ করেছেন এলাকাবাসী। তাঁদের দাবি, সাময়িক মেরামত নয়, বরং সড়কটির পানি নিষ্কাশনব্যবস্থাসহ টেকসই সংস্কার নিশ্চিত করতে হবে।
এলাকাবাসীর প্রশ্ন, প্রতিদিন হাজারো মানুষের চলাচলের এই গুরুত্বপূর্ণ সড়কটির দুর্ভোগের অবসান কবে হবে? আর কত দিন কাদা-পানি মাড়িয়ে কর্মস্থলে যেতে হবে পোশাকশ্রমিকদের? সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দেওয়া সংস্কারের আশ্বাস দ্রুত বাস্তবায়নের মধ্য দিয়েই এসব প্রশ্নের উত্তর মিলবে বলে আশা করছেন ভুক্তভোগীরা।
ঢাকা থেকে প্রকাশিত বহুল আলোচিত গনমাধ্যম জাতীয় দৈনিক চেতনায় মুক্তিযোদ্ধা পত্রিকা
© All rights reserved © 2018 News Smart
Leave a Reply