
মোঃ খাইরুল ইসলাম, নিজস্ব প্রতিবেদক, গাজীপুর
কাজের সংকট, বাড়তি ভাড়া ও নিত্যপণ্যের দামে দিশেহারা নিম্নআয়ের পরিবার
গাজীপুরের কালিয়াকৈর উপজেলায় জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় পেশাজীবী ও শ্রমজীবী মানুষের মধ্যে চরম চাপ তৈরি হয়েছে। আয় কমে যাওয়া, নির্মাণকাজের সংকট, কারখানায় ওভারটাইম কমে যাওয়া এবং বাসাভাড়াসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধিতে নিম্ন ও স্বল্প আয়ের পরিবারগুলো হিমশিম খাচ্ছে।
কালিয়াকৈর, চন্দ্রা, মৌচাক, সফিপুর, কালামপুর, বোয়ালী, শ্রীফলতলী, আটাবহ, ফুলবাড়িয়া, মেদীআশুলাইসহ পৌর এলাকার বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে কথা বলে এমন চিত্র পাওয়া গেছে।
মৌচাক এলাকার অটোরিকশাচালক জয়নাল আবেদীন (৪৫) জানান, কয়েক বছর আগেও অটো চালিয়ে প্রতিদিন ৮০০ থেকে ৯০০ টাকা পর্যন্ত আয় করতেন। বর্তমানে মহাসড়কে চলাচলে কড়াকড়ি, গ্যাসের খরচ এবং বিভিন্ন ধরনের অতিরিক্ত ব্যয়ের কারণে আয় কমে ৫০০ টাকার নিচে নেমে আসে অনেক দিন। তিনি বলেন, পাঁচ বছর আগে যে বাসার ভাড়া ছিল ১ হাজার ৫০০ টাকা, বর্তমানে সেটিই বেড়ে হয়েছে প্রায় ৫ হাজার টাকা।
চন্দ্রা এলাকার গার্মেন্টসকর্মী রহিমা বেগম (৩৮) বলেন, ৫ আগস্টের পর তার কর্মস্থল প্রায় দুই মাস বন্ধ থাকার পর চালু হলেও বর্তমানে ওভারটাইম নেই। ৮ হাজার টাকা বেতনে চার সদস্যের সংসার চালানো তার জন্য অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে।
ফুলবাড়িয়ার দিনমজুর আব্দুল মালেক (৫০) জানান, আগে দিনমজুরির কাজ করে দৈনিক প্রায় ৬০০ টাকা আয় করতেন। বর্তমানে নিয়মিত কাজ না থাকায় অনেক দিন কোনো আয় ছাড়াই থাকতে হচ্ছে।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, পাঁচ বছর আগে কালিয়াকৈর এলাকায় প্রায় ৯০০ টাকা থেকে যে বাসাভাড়া পাওয়া যেত, বর্তমানে তা বেড়ে সর্বনিম্ন প্রায় ৩ হাজার টাকা হয়েছে। বাজারে ভালো চালের দাম ৭০ থেকে ৯০ টাকা এবং মোটা চালের দাম প্রায় ৫০ টাকা কেজি। সবজির দামও অনেক ক্ষেত্রে ৬০ থেকে ৮০ টাকার নিচে নেই। ফলে নিম্নআয়ের মানুষের একটি বড় অংশ প্রয়োজনীয় পণ্য কিনতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছেন।
এর সঙ্গে জ্বালানি তেল, গ্যাস, বিদ্যুৎ, যাতায়াত, শিক্ষা ও চিকিৎসা ব্যয়ও বেড়েছে বলে অভিযোগ স্থানীয় বাসিন্দাদের। মেসে থেকে পড়াশোনার খরচ পাঁচ বছর আগের প্রায় ২ হাজার টাকা থেকে বেড়ে ৫ হাজার টাকার বেশি হওয়ায় অনেক শিক্ষার্থী পড়াশোনা চালিয়ে যেতে সমস্যায় পড়ছেন বলেও জানা গেছে।
আর্থিক সংকটে বাল্যবিয়ের ঝুঁকি
অর্থনৈতিক সংকটের কারণে কিছু পরিবার ঋণ ও কিস্তির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, কোনো কোনো পরিবার এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়েদের বিয়ে দিচ্ছে। পরবর্তীতে যৌতুক, দাম্পত্য কলহ ও আর্থিক সংকটের কারণে অনেক পরিবারকে আইনি জটিলতারও মুখোমুখি হতে হচ্ছে।
শ্রীফলতলী এলাকার ফাতেমা আক্তার (৩২) জানান, তিনি একটি এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে ১৭ বছর বয়সী মেয়ের বিয়ে দিয়েছিলেন। পরবর্তীতে তার জামাই মেয়েকে তালাক দিয়েছেন। বর্তমানে ঋণের কিস্তি পরিশোধের পাশাপাশি মেয়ের চিকিৎসার খরচ বহন করতে গিয়ে তিনি দিশেহারা হয়ে পড়েছেন। তার মেয়ে বর্তমানে গর্ভবতী বলেও জানান তিনি।
কালিয়াকৈর উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা জানান, বাল্যবিবাহ ও আর্থিক সংকটের বিষয়টি উদ্বেগজনক। এ বিষয়ে প্রতিটি ইউনিয়নে সচেতনতামূলক টিম পাঠানো হচ্ছে। ১৮ বছরের আগে মেয়েদের বিয়ে না দেওয়া এবং ঋণের বোঝা থেকে পরিবারকে রক্ষা করতে সচেতন হওয়ার আহ্বান জানানো হচ্ছে।
কালিয়াকৈর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এ এইচ এম ফখরুল হোসাইন বলেন, ৫ আগস্টের পর কিছু মিল-কারখানা বন্ধ হওয়া এবং গার্মেন্টস কারখানায় ওভারটাইম না থাকায় শ্রমজীবী মানুষের কষ্ট বেড়েছে। মহাসড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে হাইওয়ে পুলিশ কাজ করছে। এতে সাময়িক কিছু সমস্যা হলেও যানজট ও দুর্ঘটনা কমাতে এর ভূমিকা রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে মোবাইল কোর্ট পরিচালনার পাশাপাশি বখাটেদের বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত থাকবে। হতদরিদ্র পরিবারের জন্য সরকারি ভাতা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরির বিষয়েও প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
ঢাকা থেকে প্রকাশিত বহুল আলোচিত গনমাধ্যম জাতীয় দৈনিক চেতনায় মুক্তিযোদ্ধা পত্রিকা
© All rights reserved © 2018 News Smart
Leave a Reply