1. dailychatoniaymuktijuddha@gmail.com : admin :
November 6, 2026, 3:14 am

তেজগাঁও কলেজের পাশে জুতা সেলাই করেন ৪৫ বছর, অথচ তাঁর কথায় মেলে জীবন, দর্শন ও মানবতার গভীর শিক্ষা!

জীবন দেওয়ান উজ্জ্বল
  • Update Time : Thursday, November 5, 2026
  • 3 Time View

নিজস্ব প্রতিবেদক জীবন দেওয়ান উজ্জ্বল

ডিগ্রি নেই, নেই উচ্চশিক্ষার পরিচয়; তবুও তাঁর কথায় উঠে আসে জ্ঞান, বিবেক, নৈতিকতা ও জীবনের অসাধারণ দর্শন

রাজধানীর তেজগাঁও কলেজের পাশের সড়কে বসে দীর্ঘ ৪৫ বছর ধরে জুতা সেলাইয়ের কাজ করছেন এক প্রবীণ ব্যক্তি। জীবিকার তাগিদে তাঁর হাতে থাকে সুই-সুতা, জুতা আর স্যান্ডেল। কিন্তু তাঁর মুখ থেকে বেরিয়ে আসা কথাগুলো যেন জীবনের গভীর দর্শন, মানবিকতা, নৈতিকতা ও বাস্তব অভিজ্ঞতার এক অনন্য পাঠশালা। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার ডিগ্রি সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি সরাসরি কিছু বলতে চান না। অথচ তাঁর কথাবার্তা শুনলে মনে হয়, জীবনের বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি অর্জন করেছেন অসাধারণ জ্ঞান।

একজন ক্রেতার সঙ্গে কথা বলার সময় ওই ব্যক্তিকে বলতে শোনা যায়, ‘ভাই, আমার লাভ না হলে ছাড়ি কী করে? আর যদি আপনার কাছে টাকা না থাকে, নিয়ে যান।’ লোকটি চলে যাওয়ার পর তিনি মন্তব্য করেন, ‘দেখেছেন, আলোচনাই করল না। আলোচনা না করলে সমাধান হবে কীভাবে? সিদ্ধান্তে পৌঁছাবে কীভাবে?’

এরপর তিনি বলেন, পৃথিবীতে হানাহানি ও সংঘাতের অন্যতম কারণ হলো আলোচনার অভাব। তাঁর ভাষায়, ‘এমন কোনো সমস্যা নেই, যেটা আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করা যায় না।’

তাঁর মুখে ইংরেজি ‘সলভ’ শব্দ শুনে কৌতূহলী হয়ে তাঁর শিক্ষাগত যোগ্যতা সম্পর্কে জানতে চাওয়া হয়। উত্তরে তিনি বলেন, ‘আমি কিসের পড়াশোনা করব বলেন?’ কিন্তু তাঁর কথার গভীরতা দেখে প্রশ্ন জাগে, এত জ্ঞান তিনি অর্জন করলেন কীভাবে?

জীবনের দুঃখ-কষ্ট প্রসঙ্গে তাঁর বক্তব্য আরও বিস্ময়কর। তিনি বলেন, ‘দুনিয়াতে এমন কোনো জীবন আছে, যার দুঃখ নেই? যে জীবনে দুঃখ নেই, সেই জীবন কোনো জীবন নয়। দুঃখ না পেলে মানুষ আঘাত সহ্য করতে শিখবে কীভাবে? অভিজ্ঞতা অর্জন করবে কীভাবে? দুঃখের মধ্য দিয়েই মানুষ অন্যের কষ্ট বোঝে। মানসিক কষ্টকে ভয় পাই বলেই অনেক সময় অসুস্থ হয়ে পড়ি।’

শিক্ষাব্যবস্থা ও বর্তমান প্রজন্মের জ্ঞানচর্চা নিয়েও রয়েছে তাঁর গভীর পর্যবেক্ষণ। তিনি বলেন, ‘জ্ঞান অর্জন করতে চায় না ছেলেমেয়েরা। সারাদিন মোবাইল আর অন্যান্য কাজে ব্যস্ত থাকে। বাবা-মায়েরা মনে করেন, শুধু ক্লাসের পড়াই পড়তে হবে। অন্য বই পড়তে দিতে চান না। ভালো রেজাল্ট করছে, বড় বড় চাকরিও করছে; কিন্তু মনের বিস্তার হচ্ছে কি? বিচার-বিশ্লেষণের ক্ষমতা তৈরি হচ্ছে কি?’

তাঁর মতে, শুধু পাঠ্যবইয়ের মধ্যে জ্ঞানকে সীমাবদ্ধ রাখলে প্রকৃত শিক্ষার বিকাশ ঘটে না। সংবাদপত্র, সাহিত্য, উপন্যাস ও ধর্মীয় বই পড়ার অভ্যাস গড়ে তোলা প্রয়োজন। তিনি বলেন, ‘একটা পত্রিকার শুধু একটি শিরোনাম পড়লেও তা আপনার মস্তিষ্কে নাড়া দিতে পারে, নতুন কিছু ভাবতে শেখাতে পারে।’

সাফল্যের সংজ্ঞা নিয়েও তাঁর চিন্তা প্রচলিত ধারণার চেয়ে আলাদা। তাঁর ভাষায়, ‘পড়াশোনা করে বড় চাকরি করবেন, অনেক টাকা হবে, বাড়ি-গাড়ি হবে—এসবই কি সাফল্য? চারপাশের এত ভবন, এত সম্পদ দুইশ বছর পর কোথায় থাকবে? আমরা নিজেরাই বা আগামীকাল বেঁচে থাকব কি না, তার নিশ্চয়তা আছে? দৌড়ান, তাতে অসুবিধা নেই। কিন্তু নিজের মনের খাবার কেন দিচ্ছেন না? পড়াশোনা করলেই যে অনেক টাকার মালিক হতে হবে, এমন নয়। জ্ঞান দিয়ে নিজের মনকে ধনী করতে হবে।’

মানুষের প্রতারণা ও জীবনের বাস্তবতা সম্পর্কেও তিনি বলেন, ‘অনেকেই আমাকে ঠকায়। কিন্তু এসব নিয়ে বেশি ব্যথা পাই না। কারণ জানি, এই দুনিয়া একটা সফর। সফরে দুর্ঘটনা ঘটতে পারে, কেউ ধাক্কা দিতে পারে। কিন্তু নিজের বিবেকের কাছে ঠিক থাকতে হবে। সৃষ্টিকর্তার উদ্দেশ্যে আপনি কী করছেন, সেটি আপনাকেই বুঝতে হবে।’

ধর্মীয় ও নৈতিক মূল্যবোধের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, মানুষের জীবনের শেষ বলে কিছু নেই। এই পৃথিবীর জীবনকে তিনি একটি পরীক্ষার সঙ্গে তুলনা করেন। তাঁর বিশ্বাস, মানুষের প্রতিটি কাজের জবাবদিহি রয়েছে এবং অন্যায়-প্রতারণার বিচার একদিন হতেই হবে।

তাঁর পেশা সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমি জুতা সেলাইয়ের কাজ শুধু পেশা হিসেবে নিইনি, এটা আমার খেদমত। অনেক মানুষকে নিজের হাতে স্যান্ডেল বানিয়ে দিয়েছি, যাদের সামর্থ্য ছিল না। তাদের কাছ থেকে এক টাকাও নিইনি। এটা কি খেদমত নয়? এই জুতা সেলাইয়ের জায়গাটাই আমার স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়। আমি এখানে শিখছি।’

চরিত্র ও নৈতিকতা নিয়ে তাঁর বক্তব্যও বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি মনে করেন, চরিত্র বলতে শুধু একটি বিষয়কে বোঝায় না। মিথ্যা বলা, ঘুষ নেওয়া, মানুষের অর্থ আত্মসাৎ করা, অন্যকে ফাঁসানো কিংবা কারও বদনাম করাও চরিত্রের অবক্ষয়ের অংশ। তাঁর মতে, উচ্চশিক্ষার ডিগ্রি অর্জন করলেই মানুষ প্রকৃত শিক্ষিত হয় না; নিজের বিবেক ও মনকে পরিশুদ্ধ করাও শিক্ষার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

সবশেষে তিনি তরুণ প্রজন্মসহ সবার উদ্দেশে বলেন, ‘আপনিও সেরা হতে পারেন। আপনি যে কাজই করেন না কেন, সৎ থাকতে হবে। রাগ কমাতে হবে, চরিত্র ঠিক করতে হবে। দুঃখ পেলে ভেঙে পড়বেন না। কারণ দুঃখের মধ্য দিয়েই মানুষ সুখের প্রকৃত অর্থ বুঝতে শেখে। মানুষ ভুল করে, কিন্তু যারা জ্ঞান অর্জন করে, তারা সেই ভুল থেকে শিক্ষা নেয় এবং একই ভুল বারবার করে না।’

তেজগাঁও কলেজের পাশের ব্যস্ত সড়কে বসে থাকা এই জুতা সেলাইয়ের কারিগরের কথাগুলো আমাদের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলে ধরে—শিক্ষিত হওয়ার প্রকৃত অর্থ কি শুধু সনদ, ডিগ্রি আর বড় পদ-পদবি অর্জন, নাকি সততা, মানবিকতা, বিবেক, দায়িত্ববোধ ও জীবনকে বোঝার ক্ষমতাই প্রকৃত শিক্ষার পরিচয়?

হয়তো তাঁর শিক্ষাগত যোগ্যতা জানা যায়নি, কিন্তু তাঁর জীবনদর্শন আমাদের নতুন করে ভাবতে শেখায়। কারণ শিক্ষা শুধু প্রতিষ্ঠানের চার দেয়ালে সীমাবদ্ধ নয়; জীবনের প্রতিটি অভিজ্ঞতা, মানুষের প্রতি ভালোবাসা এবং নিজের বিবেকের কাছে সৎ থাকার মধ্যেও লুকিয়ে থাকে প্রকৃত শিক্ষার আলো।

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category
ঢাকা থেকে প্রকাশিত  বহুল আলোচিত গনমাধ্যম জাতীয় দৈনিক চেতনায় মুক্তিযোদ্ধা পত্রিকা    

© All rights reserved © 2018 News Smart

Themes By ShimantoIT.com