1. dailychatoniaymuktijuddha@gmail.com : admin :
November 8, 2026, 8:32 pm

দিনাজপুরে বিষক্রিয়ায় নববিবাহিত যুবকের মৃত্যু, স্ত্রীসহ পাঁচজনের বিরুদ্ধে হত্যার মামলা

Reporter Name
  • Update Time : Sunday, November 8, 2026
  • 3 Time View

নিজস্ব প্রতিবেদক, মিসেস চামেলি আক্তার প্রিয়া: দিনাজপুরের বিরামপুরে নববিবাহিত যুবক শাহাদৎ হোসেনের (২২) রহস্যজনক মৃত্যুকে কেন্দ্র করে এলাকায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। স্ত্রীর দেওয়া স্পিড পান করার পর অসুস্থ হয়ে প্রায় এক মাস চিকিৎসাধীন থাকার পর গত ৭ নভেম্বর বিকেলে দিনাজপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) তাঁর মৃত্যু হয়। নিহতের পরিবারের দাবি, চিকিৎসা পরীক্ষায় তাঁর শরীরে বিষাক্ত রাসায়নিক প্যারাকোয়াটের উপস্থিতি শনাক্ত হয়েছিল। এ ঘটনায় পরিকল্পিতভাবে বিষ প্রয়োগ করে হত্যার অভিযোগে নিহতের স্ত্রীসহ পাঁচজনকে আসামি করে বিরামপুর থানায় মামলা করেছেন তাঁর বাবা। তবে অভিযোগের সত্যতা তদন্তসাপেক্ষ বলে জানিয়েছে পুলিশ।

নিহত শাহাদৎ হোসেন বিরামপুর উপজেলার ৬ নম্বর জোতবানী ইউনিয়নের ২ নম্বর ওয়ার্ডের ধনসাডাঙ্গা গ্রামের বাসিন্দা। তিনি ওই গ্রামের মো. জাকেরুল ইসলামের ছেলে।

মামলার এজাহারে অভিযুক্ত হিসেবে যাঁদের নাম উল্লেখ করা হয়েছে, তাঁরা হলেন—নিহতের স্ত্রী তামান্না (১৯), শ্বশুর মো. কামাল (৪৫), শাশুড়ি মোছা. সুলতানা (৪২), শ্যালিকা মোছা. কামরুন্নাহার আশা (২০) এবং হাবিবপুর বাজারের একটি কীটনাশকের দোকানের কর্মচারী মো. মশফিকুর (২২)। তাঁদের সবার বাড়ি বিরামপুর উপজেলার মুকুন্দপুর ইউনিয়নের কেশবপুর গ্রামে।

বিয়ের পর থেকেই দাম্পত্য কলহের অভিযোগ

নিহতের বাবার দায়ের করা এজাহার সূত্রে জানা যায়, গত ২১ সেপ্টেম্বর ইসলামী শরিয়াহ মোতাবেক পারিবারিকভাবে শাহাদৎ ও তামান্নার বিয়ে হয়। এর চার দিন পর, ২৫ সেপ্টেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে নববধূকে শ্বশুরবাড়িতে নিয়ে আসা হয়। বিয়ের সময় ও পরবর্তী সময়ে পুত্রবধূকে প্রায় সাড়ে চার লাখ টাকা মূল্যের স্বর্ণালংকার উপহার দেওয়া হয়েছিল বলেও এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে।

তবে বিয়ের অল্প সময়ের মধ্যেই তাঁদের দাম্পত্য সম্পর্কে দূরত্ব তৈরি হয় বলে অভিযোগ করেন নিহতের বাবা। তাঁর দাবি, তামান্নার আচরণে অস্বাভাবিকতা এবং স্বামীর সংসারের প্রতি অনাগ্রহ লক্ষ্য করেন পরিবারের সদস্যরা। একপর্যায়ে তাঁরা জানতে পারেন, বিয়ের আগে থেকেই তামান্নার সঙ্গে মশফিকুর নামে এক যুবকের প্রেমের সম্পর্ক ছিল। তাঁদের মধ্যে আগে বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে যাওয়ার ঘটনাও ঘটেছিল বলে এজাহারে দাবি করা হয়েছে।

এ নিয়ে দুই পরিবারের মধ্যে আলোচনা ও বিরোধের সূত্রপাত হয়। নিহতের বাবার ভাষ্য অনুযায়ী, বিষয়টি তামান্নার পরিবারের সদস্যদের জানানো হলে তাঁরা অতীতের ঘটনা ভুলে দাম্পত্য জীবন চালিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দেন। তবে এ সময় তাঁর ছেলেকে হত্যার হুমকি দেওয়া হয়েছিল বলেও অভিযোগ করেছেন তিনি।

শ্বশুরবাড়ি থেকে ফেরার পথে স্পিড পান করানোর অভিযোগ

মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়, গত ৩ অক্টোবর শাহাদৎ তাঁর স্ত্রী তামান্নাকে বাবার বাড়িতে রেখে আসেন। কয়েক দিন পর, ১১ অক্টোবর স্ত্রীকে নিজ বাড়িতে ফিরিয়ে আনতে শ্বশুরবাড়িতে যান তিনি। সেখানে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে কথাবার্তার একপর্যায়ে মনোমালিন্য ও কথা কাটাকাটি হয়। পরে উভয় পক্ষের মধ্যে বিরোধ আরও বাড়ে বলে এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে।

নিহতের বাবার অভিযোগ, ওই বিরোধের জের ধরে অভিযুক্ত ব্যক্তিরা পরস্পরের যোগসাজশে শাহাদৎকে হত্যার পরিকল্পনা করেন। এ উদ্দেশ্যে বিষাক্ত রাসায়নিক মেশানো স্পিডের একটি বোতল তামান্নার হাতে তুলে দেওয়া হয় বলে তিনি দাবি করেন।

এজাহারের বিবরণ অনুযায়ী, ১১ অক্টোবর বিকেল আনুমানিক পাঁচটার দিকে স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে মোটরসাইকেলে বাড়ির উদ্দেশে রওনা হন শাহাদৎ। পথে হরিরামপুর মোড় অতিক্রম করার পর তামান্না তাঁর কাছে থাকা স্পিডের বোতল খুলে স্বামীকে পান করতে দেন। স্ত্রীর দেওয়া পানীয় স্বাভাবিক মনে করে তা পান করেন শাহাদৎ।

কিছুক্ষণ পর পানীয়টির স্বাদ ও গন্ধ অস্বাভাবিক মনে হলে তিনি বিষয়টি স্ত্রীকে জানান এবং তাঁকেও পানীয়টি পরীক্ষা করে দেখতে বলেন। তবে তামান্না নিজে তা পান করেননি বলে এজাহারে অভিযোগ করা হয়েছে।

পরবর্তী সময়ে বাড়ির কাছাকাছি ধনসা মাঠ এলাকায় পৌঁছালে অবশিষ্ট পানীয়টুকুও পান করতে বলা হয় বলে অভিযোগে উল্লেখ রয়েছে। তখন শারীরিকভাবে অসুস্থ বোধ করায় শাহাদৎ স্ত্রীকে অবশিষ্ট অংশ পান করতে বললেও তিনি তা না করে কৌশলে বোতলটি ফেলে দেন বলে দাবি করেছেন বাদী।

বাড়ি ফিরেই অসুস্থ, এক হাসপাতাল থেকে অন্য হাসপাতালে চিকিৎসা

বাড়িতে পৌঁছানোর পরপরই শাহাদতের শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি ঘটে। শুরু হয় বমি ও পাতলা পায়খানা। একপর্যায়ে তিনি জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন। পরিবারের সদস্যরা দ্রুত তাঁকে বিরামপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যান। সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়ার পর অবস্থার অবনতি হলে পরদিন তাঁকে দিনাজপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়।

নিহতের পরিবারের দাবি, দিনাজপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর চিকিৎসকেরা তাঁর শরীরে প্যারাকোয়াট (Paraquat) বিষক্রিয়ার বিষয়টি শনাক্ত করেন। পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠলে উন্নত চিকিৎসার জন্য তাঁকে ঢাকার ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়।

পরিবারের সদস্যরা তাঁকে ঢাকায় নিয়ে গেলেও সেখানে ভর্তি করাতে না পেরে পরবর্তী সময়ে সাভারের এনাম মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে ভর্তি করেন। সেখানে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) দুই দিন চিকিৎসা চলে। তবে তাঁর শারীরিক অবস্থার উন্নতির সম্ভাবনা কম বলে জানিয়ে হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র দেওয়া হয় বলে এজাহারে উল্লেখ করেছেন নিহতের বাবা।

এরপর শাহাদৎকে আবারও দিনাজপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে চিকিৎসকদের নিবিড় পর্যবেক্ষণে দীর্ঘদিন জীবন-মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করেন তিনি। অবশেষে গত ৭ নভেম্বর বিকেল চারটার দিকে হাসপাতালের আইসিইউতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেন ২২ বছর বয়সী এই যুবক।

তাঁর মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে পরিবার, স্বজন ও স্থানীয়দের মধ্যে শোকের ছায়া নেমে আসে।

চিকিৎসা ও পারিবারিক পরিস্থিতির কারণে মামলা করতে বিলম্ব

নিহতের বাবা এজাহারে উল্লেখ করেছেন, ছেলের অসুস্থতার পর থেকে তাঁকে বিভিন্ন হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া, চিকিৎসার ব্যবস্থা করা এবং পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে পরামর্শ করতেই দীর্ঘ সময় ব্যয় হয়েছে। এ কারণে ঘটনার পরপরই থানায় অভিযোগ দায়ের করা সম্ভব হয়নি।

এজাহারে ঘটনার সময় আশপাশে উপস্থিত ছিলেন—এমন কয়েকজন ব্যক্তির নামও প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে উল্লেখ করেছেন তিনি।

পরিবারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, এটি নিছক অসুস্থতা বা দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যু নয়; বরং পরিকল্পিতভাবে বিষাক্ত পদার্থ প্রয়োগের মাধ্যমে শাহাদৎকে হত্যা করা হয়েছে। তাঁরা ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত, জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত এবং দৃষ্টান্তমূলক আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।

তদন্তের ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেওয়া হবে: পুলিশ

এ বিষয়ে বিরামপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আব্দুর রাজ্জাক বলেন, এ ঘটনায় একটি মামলা হয়েছে। মামলাটি বর্তমানে তদন্তাধীন রয়েছে। তদন্তে প্রাপ্ত তথ্য-উপাত্ত ও সংশ্লিষ্ট আলামতের ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

নিরপেক্ষ তদন্তে প্রকৃত ঘটনা উদ্‌ঘাটনের দাবি

মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হওয়া এক যুবকের এমন মৃত্যুর ঘটনায় এলাকায় নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। স্পিডের বোতলে আদৌ বিষাক্ত পদার্থ মেশানো হয়েছিল কি না, প্যারাকোয়াট বিষক্রিয়াসংক্রান্ত চিকিৎসার নথিতে কী তথ্য রয়েছে, কথিত পরিকল্পনার সঙ্গে অভিযুক্তদের কারও সম্পৃক্ততা আছে কি না এবং ঘটনার পেছনে প্রকৃত কারণ কী—এসব বিষয় নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে উদ্‌ঘাটন করা প্রয়োজন।

সংশ্লিষ্টদের মতে, চিকিৎসার নথিপত্র, হাসপাতালের পরীক্ষার প্রতিবেদন, ঘটনাস্থল ও সম্ভাব্য আলামত, প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য এবং বোতল বা অবশিষ্ট পানীয়ের ফরেনসিক পরীক্ষার ফল তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে তদন্ত শেষ হওয়ার আগে কাউকে অপরাধী হিসেবে চূড়ান্তভাবে বিবেচনা না করে নিরপেক্ষ তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়া নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন সচেতন মহল।

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category
ঢাকা থেকে প্রকাশিত  বহুল আলোচিত গনমাধ্যম জাতীয় দৈনিক চেতনায় মুক্তিযোদ্ধা পত্রিকা    

© All rights reserved © 2018 News Smart

Themes By ShimantoIT.com