উজ্জ্বল রায়, নড়াইল থেকে:
নড়াইল সদর উপজেলার মুলিয়া ইউনিয়নের বালিয়াডাঙ্গা গ্রামের কৃতী ফুটবলার গোপাল হাজরা (৭৫)। দারিদ্র্যের কষাঘাতে বেড়ে ওঠা এই মানুষটি একসময় তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান আমলে দক্ষিণবঙ্গের অন্যতম পরিচিত ফুটবল খেলোয়াড় হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেছিলেন। ফুটবল মাঠে তাঁর অবস্থান ছিল ডিফেন্সে বা রক্ষণভাগে। প্রতিপক্ষের আক্রমণ ঠান্ডা মাথায় প্রতিহত করার অসাধারণ দক্ষতা তাঁকে অন্যদের থেকে আলাদা পরিচিতি এনে দিয়েছিল।
উচ্চতায় প্রায় ৫ ফুট ৬ ইঞ্চি গোপাল হাজরা ছিলেন সাহসী ও ব্যতিক্রমী একজন ফুটবলার। ফুটবল খেলতে তিনি কখনো বুট, মোজা, অ্যাঙ্কলেট কিংবা সেফগার্ড ব্যবহার করতেন না। খালি পায়েই খেলতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতেন। তবে খেলার সময় শাড়ির কাপড়ের দুই পাশের পাড় কেটে নিজেই ব্যান্ডেজ তৈরি করতেন। সেই কাপড় দুই পায়ের পাতা ও গোড়ালিতে পেঁচিয়ে মাঠে নামতেন। তাঁর দুই পা ও মাথার ক্ষিপ্রতা ছিল চোখে পড়ার মতো।
গোপাল হাজরার বাবা ছিলেন বিহারী লাল হাজরা এবং মা কাঞ্চনবালা। দুজনই অনেক আগে প্রয়াত হয়েছেন।
ছেলেবেলার স্মৃতি থেকেই ফুটবলের প্রতি ভালোবাসা
নিজের ফুটবল জীবনের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে গোপাল হাজরা বলেন, ছোটবেলায় ছোলম লেবু দিয়ে ফুটবল খেলা শিখেছেন তিনি। খাঁ খাঁ দুপুরে অন্যের গাছ থেকে ছোলম লেবু পেড়ে এনে বল হিসেবে ব্যবহার করতেন। পরবর্তী সময়ে নড়াইল ভিক্টোরিয়া কলেজিয়েট স্কুলে ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ার সময় চামড়ার বলে ফুটবল খেলার সুযোগ পান।
তিনি জানান, ষষ্ঠ শ্রেণি থেকেই আন্তঃস্কুল ফুটবল প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে শুরু করেন। ১৯৬৯ সালে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান আমলে বৃহত্তর যশোর জেলার অন্তর্গত নড়াইল মহকুমার আন্তঃস্কুল ফুটবল প্রতিযোগিতায় এবং ঢাকায় অনুষ্ঠিত জাতীয় পর্যায়ের প্রতিযোগিতায় নড়াইল ভিক্টোরিয়া স্কুল চ্যাম্পিয়ন হলে দেশজুড়ে ব্যাপক সাড়া পড়ে।
সেই চ্যাম্পিয়ন দলের সদস্য হিসেবে খেলেছিলেন গোলরক্ষক আব্দুস ছাত্তার, রক্ষণভাগে গোপাল হাজরা, নকুল সরকার, আব্দুল হামিদ ও রকিব। আক্রমণভাগে ছিলেন যশোরের সাচ্চু ও কায়জার এবং খুলনার রঘুরাম, মুনছুরসহ আরও অনেকে। তাঁদের মধ্যে অনেকেই ইতোমধ্যে পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছেন।
১৯৬৮ সালের ঐতিহাসিক সাফল্য
এর আগেও ১৯৬৮ সালে নড়াইল মডেল স্কুল (বর্তমানে সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয়) আন্তঃস্কুল ফুটবল প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে প্রথমে মহকুমা চ্যাম্পিয়ন, পরে বৃহত্তর যশোর জেলা চ্যাম্পিয়ন এবং সর্বশেষ তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান চ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরব অর্জন করে।
সেই সময় ভিক্টোরিয়া কলেজিয়েট স্কুলের প্রধান শিক্ষক ছিলেন মো. মোসলেম উদ্দীন স্যার।
সময়ের পরিক্রমায় ফুটবল মাঠের সেই সোনালি দিনগুলো এখন স্মৃতি। কিন্তু গোপাল হাজরার মতো একনিষ্ঠ ও সাহসী ফুটবলারের অবদান স্থানীয় ক্রীড়াঙ্গণের ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকার দাবি রাখে। তাঁর জীবনের গল্প শুধু একজন খেলোয়াড়ের স্মৃতিচারণ নয়, বরং দারিদ্র্যকে জয় করে নিজের প্রতিভা ও ভালোবাসার মাধ্যমে পরিচিতি অর্জন করা এক সংগ্রামী মানুষের জীবন্ত ইতিহাস।
ঢাকা থেকে প্রকাশিত বহুল আলোচিত গনমাধ্যম জাতীয় দৈনিক চেতনায় মুক্তিযোদ্ধা পত্রিকা
© All rights reserved © 2018 News Smart
Leave a Reply