
নিজস্ব প্রতিবেদক: মিসেস চামেলি আক্তার প্রিয়া
একজন ২৪ বছরের তরুণী। স্বামীর নির্যাতন থেকে বাঁচতে শেষ মুহূর্তে বাবাকে ফোন করে আকুতি জানাচ্ছেন। কাঁদছেন, সাহায্য চাইছেন। বলছেন, তাঁকে যেন বাঁচানো হয়। কিন্তু সেই ফোনের ওপাশে থাকা মা-বাবা মেয়েকে রক্ষা করতে ছুটে আসার আগেই সব শেষ হয়ে গেল।
রাজধানীর তেজগাঁওয়ের মণিপুরিপাড়ায় জুমরাতুন নেসা বর্ষার মৃত্যুর ঘটনা শুধু একটি পরিবারের শোকের গল্প নয়। এটি আমাদের সমাজের এমন এক নির্মম বাস্তবতা, যেখানে নির্যাতনের শিকার একজন নারীকে নিজের জীবন বাঁচানোর জন্যও শেষ মুহূর্তে বাবার কাছে আকুতি জানাতে হয়।
অভিযোগ অনুযায়ী, মঙ্গলবার গভীর রাতে স্বামী নাবিদ হোসেনের মারধরের শিকার হন বর্ষা। নির্যাতনের মধ্যে তিনি শ্বশুরবাড়ির একজনকে বারবার অনুরোধ করছিলেন, ‘ভাইয়া, আমার আব্বুরে একটা ফোন দেন, প্লিজ।’ বাবাকে ফোন দেওয়ার আকুতি জানালে তাঁকে আবার মারধর করা হয় বলেও অভিযোগ উঠেছে।
একপর্যায়ে নিজের মোবাইল ফোন থেকে মাকে ভিডিও কল করেন বর্ষা। কথা বলেন বাবার সঙ্গেও। ভিডিও কলে তাঁর ছোট বোন মেঘা দেখতে পান, বড় বোনের গলা দিয়ে রক্ত ঝরছে। সেই ভয়াবহ দৃশ্যের একটি স্ক্রিনশটও সংরক্ষণ করেন তিনি।
মেয়ের এমন অবস্থা দেখে বাবা শেখ মানোয়ার হোসেন মান্না আর ঘরে বসে থাকতে পারেননি। পুরান ঢাকার লালবাগ থেকে ছুটে যান মণিপুরিপাড়ায়। কিন্তু সেখানে পৌঁছে দেখেন, মেয়েকে অ্যাম্বুলেন্সে তোলা হয়েছে। হাসপাতালে নেওয়ার পর চিকিৎসকেরা বর্ষাকে মৃত ঘোষণা করেন।
বাবা ছুটে এসেছিলেন মেয়েকে বাঁচাতে। কিন্তু মেয়ের কাছে পৌঁছাতে পৌঁছাতে সময় ফুরিয়ে গিয়েছিল।
### প্রেমের বিয়ে, এরপর নির্যাতনের অভিযোগ
বর্ষা ও নাবিদের পরিচয় হয়েছিল তেজগাঁও কলেজে পড়ার সময়। প্রেমের সম্পর্কের পর দুই পরিবারের সম্মতিতে প্রায় এক বছর আগে তাঁদের বিয়ে হয়। কিন্তু স্বজনদের অভিযোগ, বিয়ের কয়েক মাস পর থেকেই বর্ষার ওপর নির্যাতন শুরু হয়। যৌতুকের দাবিতে তাঁকে চাপ দেওয়া হতো। মোটরসাইকেল কিনে দেওয়া ছাড়াও কয়েক দফায় নগদ টাকা দিয়েছিল তাঁর পরিবার। তবু নির্যাতন বন্ধ হয়নি বলে অভিযোগ স্বজনদের।
এর আগেও বর্ষাকে মারধর করে গুরুতর আহত করার অভিযোগ রয়েছে। মাথা, চোখসহ শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাতের কথা জানিয়েছেন তাঁর স্বজনেরা। একপর্যায়ে তাঁরা বিবাহবিচ্ছেদের সিদ্ধান্তও নিয়েছিলেন। বর্ষাকে বাবার বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল।
কিন্তু শাশুড়ি আর নির্যাতন হবে না বলে আশ্বাস দেওয়ায় দুই সপ্তাহ আগে আবার স্বামীর বাড়িতে ফিরে যান তিনি।
হয়তো বর্ষাও ভেবেছিলেন, এবার পরিস্থিতি বদলাবে। সংসারটা আবার স্বাভাবিক হবে। কিন্তু সেই ফিরে যাওয়াই যে তাঁর জীবনের শেষ অধ্যায় হয়ে উঠবে, তা কি তিনি জানতেন?
### মৃত্যুর ঘটনায় হত্যা মামলা, গ্রেপ্তার স্বামী
তেজগাঁও থানা-পুলিশ জানিয়েছে, বর্ষার গলা ও পিঠে আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে। প্রাথমিক তদন্তে ঘটনাটিকে হত্যাকাণ্ড বলে সন্দেহ করছে পুলিশ। পরিবারের অভিযোগের ভিত্তিতে যৌতুকের দাবিতে নির্যাতন করে হত্যার মামলা হয়েছে। স্বামী নাবিদ হোসেনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
অন্যদিকে, নাবিদের পরিবারের সদস্যরা বর্ষার মৃত্যুকে আত্মহত্যা বলে দাবি করেছেন। ফলে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নিশ্চিত করতে ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন ও তদন্তের ফলাফল গুরুত্বপূর্ণ। অভিযোগের সত্যতা এবং কারও দায় আইনগতভাবে নির্ধারণের বিষয়টি তদন্তসাপেক্ষ।
### আশ্বাসই কি নির্যাতিত নারীর নিরাপত্তা?
এই ঘটনার সবচেয়ে বেদনাদায়ক দিক হলো, নির্যাতনের অভিযোগ নতুন নয়। আগেও বর্ষা মারধরের শিকার হয়েছিলেন, পরিবার তাঁকে ফিরিয়ে নিয়েছিল, বিচ্ছেদের কথাও ভেবেছিল। পরে আর নির্যাতন হবে না—এমন আশ্বাসে আবার সংসারে ফিরে গিয়েছিলেন তিনি।
কিন্তু শুধু আশ্বাস কি একজন নির্যাতিত নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে?
আমাদের সমাজে এখনো অনেক সময় সংসার টিকিয়ে রাখার দায়িত্ব নারীর কাঁধেই চাপিয়ে দেওয়া হয়। বলা হয়, মানিয়ে নিতে, সহ্য করতে, আরেকটু সময় দিতে। অথচ যে সংসারে প্রতিদিনের নিরাপত্তা অনিশ্চিত, সেখানে ফিরে যাওয়ার আগে একজন নারীর নিরাপত্তা কীভাবে নিশ্চিত হবে, সেই প্রশ্নটি খুব কম মানুষই করেন।
মনে রাখতে হবে, সংসার টিকিয়ে রাখার চেয়ে মানুষের জীবন বাঁচানো বেশি জরুরি। নির্যাতনের শিকার কাউকে শুধু আপস করতে বলা নয়, তাঁর পাশে দাঁড়ানো, নিরাপদ আশ্রয়ের ব্যবস্থা করা এবং প্রয়োজন হলে আইনি সহায়তা নেওয়ার সুযোগ করে দেওয়া জরুরি।
### বাবার কাছে শেষ আকুতি, রেখে গেল অসংখ্য প্রশ্ন
বর্ষা ছিলেন তিন বোনের মধ্যে মেজ। তাঁর সামনে হয়তো আরও অনেক বছর বেঁচে থাকার কথা ছিল। ছিল জীবনের নানা স্বপ্ন, পরিবারের সঙ্গে কাটানোর অসংখ্য মুহূর্ত। আজ সেই পরিবারকেই তাঁর কবরের পাশে দাঁড়াতে হয়েছে।
বাবার কাছে বর্ষার শেষ আকুতির শব্দগুলো হয়তো সারাজীবন ফিরে ফিরে আসবে—
‘আমার আব্বুরে একটা ফোন দেন, প্লিজ।’
একজন মেয়ের কাছে শেষ মুহূর্তে বাবাকে চাওয়ার চেয়ে স্বাভাবিক আর কী হতে পারে? অথচ সেই স্বাভাবিক আকুতির উত্তর দেওয়ার আগেই থেমে গেল তাঁর জীবন।
বর্ষার মৃত্যুর সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত হোক। অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হলে দায়ীদের পরিচয় বা পারিবারিক অবস্থান যা-ই হোক, আইন অনুযায়ী বিচার নিশ্চিত করা হোক। পাশাপাশি, পারিবারিক নির্যাতনের শিকার নারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পরিবার, সমাজ ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে আরও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।
আর কোনো মেয়েকে যেন নির্যাতনের মধ্যে পড়ে শেষবারের মতো বাবাকে ফোন করে বাঁচার আকুতি জানাতে না হয়।
ঢাকা থেকে প্রকাশিত বহুল আলোচিত গনমাধ্যম জাতীয় দৈনিক চেতনায় মুক্তিযোদ্ধা পত্রিকা
© All rights reserved © 2018 News Smart
Leave a Reply