
মো. আবদুল্লাহ, বুড়িচং (কুমিল্লা) প্রতিনিধি
একসময় বিকেল হলেই গ্রামের মাঠে বসত হাডুডু খেলার জমজমাট আসর। মাঠের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ছুটে যেতেন খেলোয়াড়েরা। প্রতিপক্ষের সীমানায় ঢুকে দম ধরে ‘হাডুডু’ বলতে বলতে নিরাপদে ফিরে আসার লড়াইয়ে উত্তেজনায় মুখর হয়ে উঠত চারপাশ। খেলোয়াড়দের পাশাপাশি নারী-পুরুষ, শিশু-কিশোর থেকে শুরু করে প্রবীণরাও ভিড় জমাতেন মাঠের চারপাশে। একটি খেলাকে ঘিরেই তৈরি হতো পুরো গ্রামে উৎসবমুখর পরিবেশ।
কালের বিবর্তনে সেই চিরচেনা দৃশ্য আজ হারিয়ে যেতে বসেছে। আধুনিক প্রযুক্তি, মোবাইল ফোন, অনলাইন গেম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিস্তারে মাঠের খেলাধুলার প্রতি আগ্রহ কমছে তরুণ প্রজন্মের। অন্যদিকে, খেলার মাঠ সংকুচিত হওয়া, নিয়মিত প্রতিযোগিতার অভাব এবং সরকারি-বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতা না থাকায় অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী হাডুডু খেলা।
কুমিল্লার বুড়িচং উপজেলার পৌরসভার জরইন গ্রামে গিয়ে এমন চিত্র দেখা গেছে। স্থানীয়দের ভাষ্য, একসময় এ এলাকায় নিয়মিত হাডুডু খেলার আয়োজন হতো। দূর-দূরান্ত থেকে বিভিন্ন দল খেলতে আসত। বিকেল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত মাঠের চারপাশে থাকত দর্শকদের উপচে পড়া ভিড়। অথচ বর্তমানে সেই মাঠে খেলোয়াড়ের সংখ্যা কমে গেছে। তরুণদের বড় একটি অংশ মাঠের পরিবর্তে মোবাইল ফোন ও অনলাইন বিনোদনে সময় কাটাচ্ছেন।
মাঠের খেলা ছেড়ে মোবাইলমুখী তরুণেরা
স্থানীয় বাসিন্দা মো. সফিক বলেন, “আগে হাডুডু ছিল গ্রামের সবচেয়ে জনপ্রিয় খেলা। বিকেল হলেই ছেলেরা মাঠে চলে যেত। এখন মাঠে খেলোয়াড়ের চেয়ে মোবাইল হাতে তরুণের সংখ্যা বেশি।”
স্থানীয় বাসিন্দা মো. সাখাওয়াত বলেন, “খেলার প্রতি আগ্রহ এখনো আছে। কিন্তু নিয়মিত মাঠ, প্রশিক্ষণ, সরঞ্জাম ও প্রতিযোগিতা না থাকায় অনেকেই আর ধরে রাখতে পারছে না।”
আরেক প্রবীণ খেলোয়াড় মো. আলী হোসেন বলেন, “একসময় বিকেল হলেই আমরা মাঠে ছুটে যেতাম। হাডুডুর প্রতি সবার আলাদা ঝোঁক ও উদ্যম ছিল। খেলোয়াড়দের সামাজিকভাবেও সম্মান ছিল। এখন সেই পরিবেশ নেই। তরুণদের মধ্যেও এ খেলার ভবিষ্যৎ নিয়ে আগ্রহ তৈরি হচ্ছে না।”
শুধু খেলা নয়, গ্রামীণ ঐতিহ্য ও সম্প্রীতির প্রতীক
হাডুডু কেবল শরীরচর্চার একটি খেলা নয়; এটি গ্রামীণ সমাজের সামাজিক বন্ধন, সম্প্রীতি ও লোকজ সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। একটি ম্যাচকে কেন্দ্র করে এক গ্রামের সঙ্গে অন্য গ্রামের মানুষের যোগাযোগ তৈরি হতো। খেলাকে ঘিরে বাড়ত পরিচিতি, বন্ধুত্ব ও পারস্পরিক সৌহার্দ্য।
স্থানীয় শিক্ষক সুমন বলেন, “আমি হাডুডুর প্রতি আগ্রহী ছিলাম এবং বিভিন্ন গ্রামের মাঠে খেলোয়াড় ও সংগঠক হিসেবে যুক্ত ছিলাম। শিশু-কিশোরদের শুধু পড়াশোনা ও প্রযুক্তিনির্ভর জীবনে আটকে রাখলে তাদের শারীরিক ও সামাজিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হতে পারে। ঐতিহ্যবাহী খেলাগুলো ফিরিয়ে আনতে বিদ্যালয় ও স্থানীয় পর্যায়ে উদ্যোগ প্রয়োজন।”
প্রয়োজন সরকারি-বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতা
স্থানীয়দের মতে, হাডুডু খেলাকে টিকিয়ে রাখতে হলে শুধু খেলোয়াড় তৈরি করলেই হবে না; প্রয়োজন উপযুক্ত খেলার মাঠ সংরক্ষণ, নিয়মিত টুর্নামেন্ট আয়োজন, প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা এবং সরকারি-বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতা। পাশাপাশি বিদ্যালয় পর্যায়ে ঐতিহ্যবাহী খেলাধুলার আয়োজন করা গেলে শিশু-কিশোরদের মধ্যে এ খেলার প্রতি আগ্রহ বাড়ানো সম্ভব।
তাঁদের মতে, ইউনিয়ন ও উপজেলা পর্যায়ে নিয়মিত হাডুডু প্রতিযোগিতা আয়োজনের পাশাপাশি বিজয়ী দল ও খেলোয়াড়দের পুরস্কৃত করা হলে নতুন প্রজন্মের মধ্যে উৎসাহ তৈরি হবে। স্থানীয় ক্রীড়া সংগঠন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ সমন্বিতভাবে উদ্যোগ নিলে হারিয়ে যেতে বসা এই খেলাকে আবারও জনপ্রিয় করে তোলা সম্ভব।
ঐতিহ্য রক্ষায় এখনই উদ্যোগ প্রয়োজন
সময়ের পরিবর্তনে বিনোদনের ধরন বদলাবে, প্রযুক্তির ব্যবহারও বাড়বে—এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু সেই পরিবর্তনের স্রোতে গ্রামবাংলার শত বছরের খেলাধুলার ঐতিহ্য হারিয়ে যাক, তা চান না স্থানীয় প্রবীণ ও ক্রীড়াপ্রেমীরা।
আজ যথাযথ উদ্যোগ না নিলে একসময় গ্রামের মাঠ থেকে হারিয়ে যেতে পারে হাডুডুর চিরচেনা হাঁক। নতুন প্রজন্ম হয়তো জানবেই না, একসময় একটি খেলাকে কেন্দ্র করে কীভাবে পুরো গ্রামের মানুষ একসঙ্গে মাঠে জড়ো হতো, কীভাবে খেলোয়াড়দের প্রতিটি দৌড় আর প্রতিপক্ষের সীমানা ছোঁয়ার মুহূর্তে উচ্ছ্বাসে ফেটে পড়ত চারপাশ।
তাই গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী হাডুডুকে বাঁচাতে এখনই কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। মাঠে মাঠে আবারও ফিরে আসুক খেলোয়াড়দের প্রাণচাঞ্চল্য, দর্শকদের উচ্ছ্বাস আর সেই চিরচেনা ধ্বনি—‘হাডুডু… হাডুডু…’।
ঢাকা থেকে প্রকাশিত বহুল আলোচিত গনমাধ্যম জাতীয় দৈনিক চেতনায় মুক্তিযোদ্ধা পত্রিকা
© All rights reserved © 2018 News Smart
Leave a Reply