
জাহাঙ্গীর আলম, জেলা প্রতিনিধি ব্রাহ্মণবাড়িয়া: টেটা-বল্লমের হামলায় নিহত কৃষক, আহত পুলিশ সদস্য; অতিরিক্ত পুলিশ ও ফাঁকা গুলিতে নিয়ন্ত্রণে পরিস্থিতি, এলাকাজুড়ে থমথমে অবস্থা।
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইল উপজেলার প্রান্তিক হাওরের মাছের ইজারা, পানি নিয়ন্ত্রণ এবং স্থানীয় আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে চার গ্রামের মানুষের মধ্যে নজিরবিহীন রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। প্রায় পাঁচ ঘণ্টাব্যাপী চলা এ সংঘর্ষে বল্লমের আঘাতে মো. খাদিম সর্দার (৫২) নামে এক ব্যক্তি নিহত হয়েছেন। এছাড়া উভয় পক্ষের অন্তত অর্ধশতাধিক মানুষ আহত হয়েছেন। আহতদের মধ্যে কয়েকজন পুলিশ সদস্যও রয়েছেন। সংঘর্ষের ঘটনায় পুরো এলাকায় চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।
সোমবার (২৯ জুন) সন্ধ্যা থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত উপজেলার ধর্মতীর্থ, সূর্যকান্দি, চাকসার ও মূলবর্গ গ্রামের লোকজনের মধ্যে দফায় দফায় এ সংঘর্ষ চলে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে সরাইল থানা পুলিশের পাশাপাশি ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা পুলিশ লাইনের অতিরিক্ত সদস্য মোতায়েন করা হয়। একপর্যায়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কয়েক দফা ফাঁকা গুলি ছুড়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।
নিহত মো. খাদিম সর্দার ধর্মতীর্থ চাকসার গ্রামের মৃত শামসু হকের ছেলে। তিনি দুই ছেলে ও তিন মেয়ের জনক ছিলেন। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত খাদিমের মৃত্যুতে পরিবারে নেমে এসেছে শোকের মাতম। স্বজনদের আহাজারিতে হাসপাতাল ও বাড়ির পরিবেশ ভারী হয়ে ওঠে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ধর্মতীর্থ এলাকার প্রান্তিক হাওরের ‘পাঠিবান’-এ বর্ষার পানি আটকে দেশীয় মাছের উৎপাদন বৃদ্ধি এবং বর্ষা শেষে মাছ আহরণের ইজারা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে কয়েকটি গ্রামের মধ্যে বিরোধ চলছিল। এ বিরোধের সঙ্গে স্থানীয় প্রভাব বিস্তার ও আধিপত্যের প্রশ্ন জড়িয়ে পড়ায় উত্তেজনা ক্রমেই বাড়তে থাকে। একাধিকবার সালিশের উদ্যোগ নেওয়া হলেও স্থায়ী সমাধান না হওয়ায় শেষ পর্যন্ত বিরোধ রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে রূপ নেয়।
সোমবার সন্ধ্যা সাতটার দিকে উভয় পক্ষের শত শত মানুষ দেশীয় অস্ত্র নিয়ে মুখোমুখি অবস্থান নেয়। কিছুক্ষণের মধ্যেই সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে কালিকচ্ছ বাজারসংলগ্ন এলাকায়। রাতের অন্ধকারে টর্চলাইটের আলোয় টেটা, বল্লম, লাঠি, রামদা ও ধারালো দেশীয় অস্ত্র নিয়ে একে অপরের ওপর হামলা চালায় সংঘর্ষকারীরা। চারদিকে চিৎকার, ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া ও অস্ত্রের ঝনঝনানিতে পুরো এলাকা রণক্ষেত্রে পরিণত হয়।
সংঘর্ষের কারণে আশপাশের গ্রামগুলোতে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। নারী, শিশু ও বৃদ্ধরা ঘরের দরজা-জানালা বন্ধ করে নিরাপদ আশ্রয় নেওয়ার চেষ্টা করেন। অনেক পরিবার রাতভর আতঙ্কে নির্ঘুম কাটায়। সংঘর্ষের কারণে কালিকচ্ছ সড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। দূরপাল্লার যাত্রী ও সাধারণ মানুষ চরম দুর্ভোগে পড়েন।
সংঘর্ষ চলাকালে গুরুতর আহত হন মো. খাদিম সর্দার। স্থানীয় কয়েকজন যুবক তাকে দ্রুত সরাইল ৫০ শয্যাবিশিষ্ট উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, তার পিঠের বাম পাশে বল্লমের গভীর আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে। অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের কারণেই তার মৃত্যু হয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে। তবে ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পাওয়ার পর মৃত্যুর সুনির্দিষ্ট কারণ নিশ্চিত হওয়া যাবে।
সংঘর্ষের খবর পেয়ে সরাইল থানা পুলিশের একাধিক টিম ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করে। কিন্তু সংঘর্ষকারীদের হামলায় কয়েকজন পুলিশ সদস্য আহত হন। পরে অতিরিক্ত পুলিশ ঘটনাস্থলে এসে কয়েক দফা ফাঁকা গুলি ছুড়ে উভয় পক্ষকে ছত্রভঙ্গ করে। রাত প্রায় ১২টার দিকে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এলেও এলাকাজুড়ে এখনও উত্তেজনা বিরাজ করছে।
স্থানীয়দের দাবি, সংঘর্ষে আহতের সংখ্যা অর্ধশতাধিক। অনেকেই ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা সদর হাসপাতাল, সরাইল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স এবং বিভিন্ন বেসরকারি ক্লিনিকে চিকিৎসা নিচ্ছেন। আবার অনেকে প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়ে বাড়িতে ফিরে গেছেন ধারণা করা হচ্ছে।
ঘটনার পর ধর্মতীর্থ, সূর্যকান্দি, চাকসার ও মূলবর্গ এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ স্থানে টহল জোরদার করা হয়েছে, যাতে নতুন করে কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা না ঘটে।
পুলিশ নিহতের মরদেহ উদ্ধার করে সুরতহাল প্রতিবেদন সম্পন্ন করেছে এবং ময়নাতদন্তের জন্য ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা সদর হাসপাতালের মর্গে পাঠিয়েছে।
সরাইল থানা পুলিশ জানিয়েছে, সংঘর্ষে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্তে কাজ চলছে। ঘটনার প্রকৃত কারণ, পরিকল্পনাকারী এবং হামলায় অংশগ্রহণকারীদের বিরুদ্ধে তদন্ত শেষে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। একই সঙ্গে এলাকাবাসীকে শান্ত থাকার আহ্বান জানিয়েছে প্রশাসন।
এদিকে নিহত খাদিম সর্দারের পরিবার ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের দ্রুত গ্রেপ্তার এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের প্রত্যাশা, নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে দোষীদের আইনের আওতায় এনে বিচার নিশ্চিত করা হবে। একই সঙ্গে দীর্ঘদিনের জলমহাল ও মাছের ইজারা-সংক্রান্ত বিরোধের স্থায়ী সমাধানে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা, যাতে ভবিষ্যতে এ ধরনের প্রাণঘাতী সংঘর্ষের পুনরাবৃত্তি না ঘটে।
এই প্রতিবেদনটি দৈনিক পত্রিকার প্রথম পাতার লিড নিউজ হিসেবে প্রকাশের উপযোগী করে সাজানো হয়েছে। চাইলে আমি এটিকে ৮ কলামের ব্যানার নিউজ আকারেও ডিজাইন করে দিতে পারি।
ঢাকা থেকে প্রকাশিত বহুল আলোচিত গনমাধ্যম জাতীয় দৈনিক চেতনায় মুক্তিযোদ্ধা পত্রিকা
© All rights reserved © 2018 News Smart
Leave a Reply