
বীরশ্রেষ্ঠ ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট মতিউর রহমানের ৮৫তম জন্মবার্ষিকীতে শ্রদ্ধাঞ্জলি
লেখা: জীবন দেওয়ান উজ্জ্বল
কাউকে একসময় দেশদ্রোহী বলা হয়েছিল, অথচ ইতিহাস তাঁকেই দিয়েছে দেশের সর্বোচ্চ সামরিক বীরত্বসূচক খেতাব ‘বীরশ্রেষ্ঠ’। তিনি বীরশ্রেষ্ঠ ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট মতিউর রহমান। মাতৃভূমির স্বাধীনতার জন্য জীবন বাজি রেখে পাকিস্তান থেকে একটি যুদ্ধবিমান নিয়ে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেওয়ার পরিকল্পনা করেছিলেন তিনি। কিন্তু সেই দুঃসাহসী অভিযান শেষ পর্যন্ত তাঁকে নিয়ে যায় মৃত্যুর পথে। তবু তাঁর আত্মত্যাগ ও দেশপ্রেম আজও বাঙালির হৃদয়ে অমর।
দেশপ্রেমের টানে অসম্ভব এক অভিযানের পরিকল্পনা
মতিউর রহমান ছিলেন পাকিস্তান বিমানবাহিনীর একজন বাঙালি ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট। সামরিক বিমান চালনায় দক্ষ এই কর্মকর্তা ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে পাকিস্তান থেকে পালিয়ে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেওয়ার পরিকল্পনা করেন।
২৫ মার্চের গণহত্যার পর বাঙালির ওপর পাকিস্তানি বাহিনীর দমন-পীড়ন তাঁকে গভীরভাবে নাড়া দেয়। নিজের পেশাগত অবস্থান ও ব্যক্তিগত নিরাপত্তার কথা উপেক্ষা করে তিনি দেশের স্বাধীনতার পক্ষে কাজ করার সিদ্ধান্ত নেন।
বিভিন্ন ঐতিহাসিক বিবরণে তাঁর পরিকল্পনা, সাহস ও দেশপ্রেমের কথা উঠে এসেছে। তবে তাঁর অভিযানের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা কিছু রোমাঞ্চকর কাহিনির সব বিবরণ সমানভাবে নির্ভরযোগ্য সূত্রে প্রতিষ্ঠিত নয়।
২০ আগস্ট ১৯৭১: ইতিহাসের পাতায় লেখা এক দুঃসাহসী অধ্যায়
১৯৭১ সালের ২০ আগস্ট পাকিস্তানের করাচির মাসরুর বিমানঘাঁটিতে ঘটে সেই আলোচিত ঘটনা। মতিউর রহমান পাকিস্তান বিমানবাহিনীর একটি টি-৩৩ প্রশিক্ষণ বিমান নিয়ে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেওয়ার উদ্দেশ্যে উড্ডয়নের চেষ্টা করেন। বিমানটির নাম ছিল ‘ব্লু বার্ড’। সেটি চালানোর কথা ছিল ২১ বছর বয়সী পাকিস্তানি পাইলট অফিসার রশিদ মিনহাজের।
মতিউর রহমান বিমানে ওঠার পর সেটির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দুজনের মধ্যে সংঘর্ষ শুরু হয়। রশিদ মিনহাজ বিমানটির নিয়ন্ত্রণ ফিরে পাওয়ার চেষ্টা করেন। একপর্যায়ে বিমানটি পাকিস্তানের সিন্ধু প্রদেশের ঠাট্টা এলাকায় বিধ্বস্ত হয়। এতে দুই পাইলটই নিহত হন।
মতিউর রহমানের লক্ষ্য ছিল পাকিস্তান ছেড়ে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেওয়া। কিন্তু সীমান্ত অতিক্রম করার আগেই তাঁর সেই অভিযান থেমে যায়। মাত্র ২৯ বছর বয়সে জীবন দিয়ে যান এই বাঙালি বীর।
দুই দেশের দুই সামরিক সম্মান
একই বিমান দুর্ঘটনায় নিহত দুই পাইলট নিজ নিজ দেশের সর্বোচ্চ সামরিক বীরত্বের স্বীকৃতি পান। পাকিস্তান রশিদ মিনহাজকে ‘নিশান-ই-হায়দার’ উপাধিতে ভূষিত করে। অন্যদিকে বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধে অসামান্য সাহসিকতা ও আত্মত্যাগের স্বীকৃতিস্বরূপ মতিউর রহমানকে মরণোত্তর ‘বীরশ্রেষ্ঠ’ খেতাব দেওয়া হয়।
বাংলাদেশের সাতজন বীরশ্রেষ্ঠের একজন হিসেবে মতিউর রহমানের নাম চিরদিনের জন্য স্থান করে নেয় জাতির গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাসে।
পাকিস্তানের মাটিতে সমাহিত, ৩৫ বছর পর স্বদেশে প্রত্যাবর্তন
মৃত্যুর পর মতিউর রহমানকে পাকিস্তানের করাচির মাসরুর বিমানঘাঁটির চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের কবরস্থানে সমাহিত করা হয়েছিল বলে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের ঐতিহাসিক প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে।
দীর্ঘ ৩৫ বছর পর, ২০০৬ সালের ২৪ জুন তাঁর দেহাবশেষ বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনা হয়। পরদিন ২৫ জুন ঢাকার মিরপুর শহীদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে পূর্ণ রাষ্ট্রীয় ও সামরিক মর্যাদায় তাঁকে পুনঃসমাহিত করা হয়।
এটি ছিল শুধু একজন বীরের দেহাবশেষের স্বদেশ প্রত্যাবর্তন নয়; বরং স্বাধীনতার জন্য জীবন উৎসর্গ করা এক সন্তানের প্রতি জাতির গভীর শ্রদ্ধা নিবেদনের মুহূর্ত।
ইতিহাসে অমর এক বীর
মতিউর রহমানের জীবন আমাদের শেখায়, দেশপ্রেম কেবল মুখের কথা নয়; প্রয়োজনে নিজের জীবন দিয়েও তার প্রমাণ দিতে হয়। তিনি হয়তো তাঁর পরিকল্পনা অনুযায়ী মুক্তিযুদ্ধে সরাসরি অংশ নেওয়ার সুযোগ পাননি, কিন্তু স্বাধীনতার পক্ষে তাঁর দুঃসাহসী পদক্ষেপ তাঁকে বাংলাদেশের ইতিহাসে অনন্য মর্যাদা দিয়েছে।
যাঁকে একসময় পাকিস্তানের সামরিক ব্যবস্থার চোখে বিশ্বাসঘাতক হিসেবে দেখা হয়েছিল, স্বাধীন বাংলাদেশ তাঁকেই বীরের সম্মানে ভূষিত করেছে। কারণ দেশ ও জাতির স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষাই তাঁর অভিযানের মূল প্রেরণা ছিল।
বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর রহমানের জন্ম ১৯৪১ সালের ২৯ অক্টোবর। ২০২৬ সালের ২৯ অক্টোবর তাঁর ৮৫তম জন্মবার্ষিকী পালিত হয়েছে।
জন্মদিনে এই অকুতোভয় বীরের প্রতি জানাই বিনম্র শ্রদ্ধা ও গভীর ভালোবাসা।
শুভ জন্মবার্ষিকী, বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর রহমান।
আপনি বেঁচে থাকবেন বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসে, নতুন প্রজন্মের সাহসে এবং কোটি মানুষের হৃদয়ে—চিরকাল।
লেখা: জীবন দেওয়ান উজ্জ্বল
ঢাকা থেকে প্রকাশিত বহুল আলোচিত গনমাধ্যম জাতীয় দৈনিক চেতনায় মুক্তিযোদ্ধা পত্রিকা
© All rights reserved © 2018 News Smart
Leave a Reply