
মো.আবদুল্লাহ, বুড়িচং (কুমিল্লা) প্রতিনিধি
একসময় প্রিয়জনের একটি চিঠির অপেক্ষায় প্রহর গুনতেন মানুষ। ডাকপিয়নের সাইকেলের ঘণ্টা কিংবা বাড়ির উঠানে তাঁর উপস্থিতি মুহূর্তেই আনন্দে ভরিয়ে দিত অপেক্ষমাণ হৃদয়। প্রিয় মানুষের হাতের লেখা কয়েকটি লাইন পড়েই ভুলে যেতেন দূরত্বের কষ্ট। সেই চিঠিতে মিশে থাকত ভালোবাসা, আবেগ, অভিমান আর না বলা হাজারো কথা। অথচ সময়ের বিবর্তনে সেই চিরচেনা দৃশ্য আজ প্রায় হারিয়ে গেছে। একসময়ের ব্যস্ত ডাকঘরগুলো এখন নীরব, আর ডাকবাক্সে প্রেমপত্রের পরিবর্তে জায়গা করে নিচ্ছে বিভিন্ন দাপ্তরিক কাগজপত্র ও আইনি নোটিশ।
কুমিল্লার বুড়িচং উপজেলার অধিকাংশ শাখা ডাকঘরের বর্তমান চিত্র এমনই করুণ বলে জানা গেছে। একসময় গ্রামীণ জনপদের যোগাযোগব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত এসব ডাকঘর এখন অবহেলা, অযত্ন ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে জৌলুস হারাতে বসেছে। কোথাও ডাকঘরের আশপাশে গজিয়েছে ঝোপঝাড় ও জঙ্গল, কোথাও আবার ভবনের দরজায় ঝুলছে তালা।
প্রযুক্তির যুগে হারিয়ে গেছে চিঠির আবেগ
একসময় দূরে থাকা প্রিয়জনের কাছে মনের কথা পৌঁছে দেওয়ার প্রধান মাধ্যম ছিল চিঠি। প্রিয় মানুষের চিঠি হাতে পেতে কেউ কেউ দিনের পর দিন অপেক্ষা করতেন। ডাকঘরে চিঠি জমা দেওয়া থেকে শুরু করে ডাকপিয়নের মাধ্যমে তা গ্রাম-গঞ্জের বাড়িতে পৌঁছে দেওয়া—সব মিলিয়ে ডাকব্যবস্থার সঙ্গে জড়িয়ে ছিল মানুষের আবেগ ও স্মৃতি।
কিন্তু মোবাইল ফোন, ইন্টারনেট, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও তাৎক্ষণিক বার্তা আদান-প্রদানের প্রযুক্তি সেই চিত্র পাল্টে দিয়েছে। এখন মুহূর্তের মধ্যেই দূর-দূরান্তে থাকা মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব। ফলে ব্যক্তিগত চিঠির ব্যবহার কমতে কমতে প্রায় বিলুপ্তির পথে।
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, বুড়িচং উপজেলার কোনো কোনো ডাকঘরে দীর্ঘদিন ধরে ব্যক্তিগত চিঠির আনাগোনা নেই বললেই চলে। কোথাও কোথাও গত এক বছরেও ব্যক্তিগত চিঠি আসেনি বলে দাবি করেছেন স্থানীয়রা। একসময় প্রেমপত্র ও ব্যক্তিগত বার্তায় মুখর থাকা ডাকঘরগুলো এখন যেন অতীতের স্মৃতি বহন করছে।
প্রেমপত্রের বদলে আসছে আইনি নোটিশ
ব্যক্তিগত চিঠিপত্রের প্রচলন কমে গেলেও ডাকঘরের কিছু দাপ্তরিক কার্যক্রম এখনো চালু রয়েছে। এসব ডাকঘরে সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের নিয়োগপত্র, ব্যাংক ও বিমাসংক্রান্ত নোটিশ, আদালতের চিঠি, মামলা-সংক্রান্ত কাগজপত্র এবং সমন আসতে দেখা যায়।
এ ছাড়া বিভিন্ন আইনি নোটিশ ও বিবাহবিচ্ছেদ-সংক্রান্ত কাগজপত্রও ডাকযোগে পাঠানো হয়। স্থানীয়দের বর্ণনায়, একসময়ের প্রেমপত্রের জায়গা দখল করেছে এসব আনুষ্ঠানিক ও আইনি চিঠিপত্র। এ বাস্তবতা থেকেই উঠে এসেছে সময়ের পরিবর্তনকে তুলে ধরা সেই আক্ষেপের কথা—‘পোস্ট অফিসে এখন আর প্রেমপত্র আসে না, আসে শুধু তালাকপত্র।’
অবহেলায় হারাচ্ছে ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠান
ডাকঘর শুধু চিঠি আদান-প্রদানের স্থান নয়; এটি গ্রামীণ জনপদের ইতিহাস, স্মৃতি ও যোগাযোগব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। একসময় ডাকপিয়ন ও রানাররা বাইসাইকেলে কিংবা পায়ে হেঁটে গ্রাম-গঞ্জের মানুষের কাছে চিঠি পৌঁছে দিতেন। ডাকবাক্স খোলা, চিঠি বাছাই এবং নির্দিষ্ট ঠিকানায় তা পৌঁছে দেওয়ার ব্যস্ততা ছিল ডাকঘরের নিত্যদিনের দৃশ্য।
কিন্তু আধুনিক প্রযুক্তির প্রসার, ব্যক্তিগত চিঠির ব্যবহার কমে যাওয়া এবং যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে অনেক গ্রামীণ ডাকঘর আজ কার্যত গুরুত্ব হারাচ্ছে বলে স্থানীয়দের অভিযোগ।
এ পরিস্থিতিতে ডাকঘরগুলোর অবকাঠামো সংস্কার, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ এবং আধুনিক ডাকসেবা চালুর ওপর গুরুত্ব দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন সচেতন মহল। তাঁদের মতে, সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে ডাকঘরগুলোর সেবার পরিধি বাড়ানো গেলে এসব ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠানকে নতুনভাবে কার্যকর করে তোলা সম্ভব।
একসময় যে ডাকঘর মানুষের ভালোবাসা, আবেগ ও অপেক্ষার সাক্ষী ছিল, আজ সেখানে নীরবতা। প্রেমপত্রের সেই রোমাঞ্চ হয়তো আর ফিরবে না, কিন্তু যথাযথ উদ্যোগ ও আধুনিক সেবার মাধ্যমে গ্রামীণ ডাকঘরগুলো আবারও মানুষের প্রয়োজনীয় প্রতিষ্ঠানে পরিণত হতে পারে—এমন প্রত্যাশা স্থানীয়দের।
ঢাকা থেকে প্রকাশিত বহুল আলোচিত গনমাধ্যম জাতীয় দৈনিক চেতনায় মুক্তিযোদ্ধা পত্রিকা
© All rights reserved © 2018 News Smart
Leave a Reply