মোঃ খায়রুল ইসলাম
কালিয়াকৈর, গাজীপুর
সরকারি দামের চেয়ে ৫০০ টাকা বেশি, বিপাকে শ্রমিক-নিম্নআয়ের মানুষ
শিল্পনগরী কালিয়াকৈরে এলপিজি গ্যাসের বাজারে অস্থিরতা ও অতিরিক্ত দামে বিক্রির অভিযোগে বিপাকে পড়েছেন সাধারণ ভোক্তারা। বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) নির্ধারিত ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের দাম ১ হাজার ৭২৮ টাকা হলেও কালিয়াকৈরের বিভিন্ন বাজারে সেটি ২ হাজার ২০০ থেকে ২ হাজার ৩০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন ক্রেতারা। এতে প্রতি সিলিন্ডারে সরকার নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে প্রায় ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা বেশি গুনতে হচ্ছে তাদের।
এলপিজির এই বাড়তি দামে সবচেয়ে বেশি চাপে পড়েছেন কালিয়াকৈরের পোশাকশ্রমিক, নিম্নআয়ের পরিবার, অটোরিকশাচালক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও শিক্ষার্থীরা। একদিকে বাড়ছে নিত্যপণ্যের দাম, অন্যদিকে গ্যাসের অতিরিক্ত খরচ—সব মিলিয়ে অনেক পরিবারের মাসিক বাজেটে তৈরি হয়েছে বাড়তি চাপ। স্থানীয়দের ভাষায়, “গ্যাসের দাম বাড়ছে, কিন্তু আয় তো বাড়ছে না।”
শনিবার (৩ অক্টোবর) কালিয়াকৈর বাজার, চন্দ্রা ত্রিমোড়, হরতকীতলা-আমতলা মোড়, পল্লী বিদ্যুৎ, মৌচাক, সফিপুর, কালামপুর ও ফুলবাড়ীয়া এলাকার বিভিন্ন দোকানে সরেজমিনে গিয়ে ক্রেতা-বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে এসব অভিযোগ পাওয়া যায়। তবে দোকান ও সরবরাহভেদে বিক্রয়মূল্যে কিছুটা পার্থক্য রয়েছে।
‘১০ হাজার টাকা বেতনে সংসার চালানোই কঠিন’
চন্দ্রার বাসিন্দা পোশাকশ্রমিক সিয়াম হোসেন (২৮) বলেন, আগে ১ হাজার ৫০০ থেকে ১ হাজার ৬০০ টাকার মধ্যে একটি সিলিন্ডার কিনতেন। এখন একই সিলিন্ডারের জন্য ২ হাজার ২০০ থেকে ২ হাজার ৩০০ টাকা দিতে হচ্ছে।
তিনি বলেন, “১০ হাজার টাকা বেতনে ঘরভাড়া, গ্যাস, চাল-ডালসহ সংসার চালানো খুব কষ্ট হয়ে যাচ্ছে। আমরা চাই, সরকার নির্ধারিত দামে যেন গ্যাস কিনতে পারি।”
মৌচাকের গৃহিণী রহিমা খাতুন (৪২) বলেন, স্বামী গার্মেন্টসে চাকরি করেন। সিলিন্ডারের দাম বেড়ে যাওয়ায় সংসারের খরচও বেড়েছে। কখনো কখনো অন্যের চুলায় রান্না করে সন্তানদের খাওয়ানোর পরিস্থিতি তৈরি হয় বলেও জানান তিনি।
কয়েক দিনের আয় চলে যাচ্ছে এক সিলিন্ডারে
সফিপুরের অটোরিকশাচালক আব্দুল লতিফ (৫০) বলেন, সারাদিনে প্রায় ৬০০ টাকা আয় করেন। একটি সিলিন্ডার কিনতেই তার কয়েক দিনের আয় চলে যায়। তার দাবি, “বাজারে প্রশাসনের মনিটরিং আরও বাড়ানো দরকার।”
কালিয়াকৈর বাজারের চা দোকানি জয়নাল আবেদীন (৬০) বলেন, আগে দুইটি সিলিন্ডার প্রায় ৩ হাজার ২০০ টাকায় কিনতেন। এখন একই পরিমাণ গ্যাস কিনতে প্রায় ৪ হাজার ৪০০ টাকা লাগে। কিন্তু চায়ের দাম ইচ্ছেমতো বাড়ানো সম্ভব নয়। ফলে ব্যবসা চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে বলে জানান তিনি।
চন্দ্রার একটি মেসের কলেজছাত্রী ফাতেমা আক্তার বলেন, পাঁচজন মিলে একটি সিলিন্ডার ব্যবহার করেন। আগে জনপ্রতি প্রায় ৩০০ টাকা খরচ হলেও এখন তা বেড়ে প্রায় ৫০০ টাকা হয়েছে। শিক্ষার্থীদের জন্য এটিও বাড়তি আর্থিক চাপ বলে জানান তিনি।
‘আমরাও ডিলারের কাছ থেকে বেশি দামে কিনি’
তবে খুচরা ব্যবসায়ীদের দাবি, তারা নিজেরাও ডিলার পর্যায় থেকে বেশি দামে সিলিন্ডার কিনতে বাধ্য হচ্ছেন।
খুচরা ব্যবসায়ী রাসেল হোসেন বলেন, “আমরা ডিলারের কাছ থেকে বেশি দামে কিনি। তাই বেশি দামে বিক্রি করতে হয়। পরিবহন খরচও আছে। সরকারি দামে যদি আমরা পেতাম, তাহলে সরকারি দামেই বিক্রি করতাম।”
পল্লী বিদ্যুৎ এলাকার মায়ের দোয়া এন্টারপ্রাইজের এক ব্যবসায়ীও দাবি করেন, কোম্পানি ও ডিলার পর্যায়েই তাদের কাছে সিলিন্ডারের দাম বেশি পড়ে। ফলে খুচরা পর্যায়ে এসে দাম আরও বেড়ে যায়।
‘অতিরিক্ত দাম নিলে ভ্রাম্যমাণ আদালতে ব্যবস্থা’
কালিয়াকৈর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এ এইচ এম ফখরুল হুসাইন বলেন, এলপিজি সিলিন্ডার সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে বিক্রির অভিযোগ তারা পেয়েছেন।
তিনি বলেন, “বিইআরসি নির্ধারিত দামে বিক্রি না করা ভোক্তা অধিকার আইনের লঙ্ঘন। আমরা খুব দ্রুত বাজার মনিটরিং জোরদার করব। প্রতিটি দোকানে মূল্যতালিকা টানানো বাধ্যতামূলক করা হবে। কোথাও অতিরিক্ত দাম নেওয়ার প্রমাণ পেলে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”
‘গরিবের চুলা নিয়ে ব্যবসা করতে দেওয়া হবে না’
কালিয়াকৈর পৌরসভার সম্ভাব্য মেয়র প্রার্থী, সমাজসেবক ও শিক্ষানুরাগী মোঃ সাইজুদ্দিন বলেন, “কালিয়াকৈর হলো গরিব মানুষ ও শ্রমিকের শহর। প্রায় ৬ লাখ পোশাকশ্রমিক সকাল থেকে রাত পর্যন্ত পরিশ্রম করে সংসার চালান। তাদের বেতনের বড় অংশ যদি গ্যাস কিনতেই চলে যায়, তাহলে তারা খাবে কী?”
তিনি বলেন, বাজারে গিয়ে তিনি সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ দেখেছেন। “গরিবের চুলা নিয়ে কাউকে ব্যবসা করতে দেওয়া উচিত নয়। সিন্ডিকেটের নামে কেউ অতিরিক্ত দাম নিলে তার বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষকে সঙ্গে নিয়ে প্রতিবাদ করা হবে।”
তিনি প্রশাসনের প্রতি দ্রুত বাজার অভিযান পরিচালনার আহ্বান জানান। পাশাপাশি পৌরবাসীর সেবা করার সুযোগ পেলে পৌরসভার উদ্যোগে ন্যায্যমূল্যে এলপিজি বিক্রির জন্য ডিলার পয়েন্ট ও মনিটরিং সেল গঠনের উদ্যোগ নেওয়ার কথাও জানান।
শুধু দাম নির্ধারণ নয়, দরকার কঠোর বাজার নজরদারি
জ্বালানি খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, বিইআরসি নির্ধারিত মূল্য বাস্তবে কার্যকর করতে শুধু মূল্য ঘোষণা করলেই হবে না। বাজারে পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত করার পাশাপাশি ডিলার ও খুচরা পর্যায়ে নিয়মিত তদারকি প্রয়োজন।
কালিয়াকৈরের সাধারণ ভোক্তাদের দাবি, অবিলম্বে বাজার মনিটরিং জোরদার করতে হবে। প্রতিটি ডিলার ও খুচরা বিক্রয়কেন্দ্রে মূল্যতালিকা প্রদর্শন নিশ্চিত করতে হবে এবং সরকার নির্ধারিত দামে এলপিজি সরবরাহের ব্যবস্থা করতে হবে।
তাদের সরল প্রশ্ন—সরকারি দামে যদি বাজারে গ্যাস না-ই পাওয়া যায়, তাহলে নির্ধারিত মূল্য নির্ধারণের সুফল সাধারণ ভোক্তারা পাবেন কীভাবে?
সম্পাদক ও প্রকাশক: - ইসলামী স্কলার মাওঃ জীবন দেওয়ান উজ্জ্বল ★ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: -কাজী মোস্তফা রুমি★ উপ সম্পাদক: -দেওয়ান কামরুজ্জামান কাজল★নির্বাহী সম্পাদক: ডাঃ মোঃ শাহীন মিয়া, ★বার্তা সম্পাদক: মোঃ সোহেল রানা ★সহ বার্তা সম্পাদিকা: মিস রত্না আক্তার★বিজ্ঞাপন বিষয়ক সম্পাদিকা: মিসেস চামেলী আক্তার। ফোন:+৮৮ ০১৯১১০০৪৮২৫, +৮৮০১৭১৫৬৭২০৯৭
© স্বত্ব সংরক্ষিত © ২০২৬